০৫:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোনগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে যান: বজ্রপাত থেকে বাঁচার বাস্তব নির্দেশনা

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বজ্রপাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আগে বছরে নির্দিষ্ট সময়ে বজ্রপাত বেশি দেখা গেলেও এখন প্রায় সব মৌসুমেই কোথাও না কোথাও বজ্রপাতের খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে গ্রামের খোলা মাঠ, হাওর অঞ্চল, নদীর পাড়, এমনকি শহরের উঁচু ভবনের এলাকাও এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। প্রতি বছর বহু মানুষ শুধুমাত্র অসচেতনতার কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ সামান্য সতর্কতা অনেক জীবন বাঁচাতে পারে।

বজ্রপাত মূলত আকাশের বিশাল বৈদ্যুতিক স্রোত। মেঘের মধ্যে পানি, বরফকণা ও বাতাসের সংঘর্ষে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়। সেই চার্জ হঠাৎ মেঘ থেকে মাটিতে বা এক মেঘ থেকে আরেক মেঘে ছুটে গেলে সৃষ্টি হয় বজ্রপাত। তখন প্রচণ্ড আলো ও বিকট শব্দ দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বাতাসে জলীয়বাষ্প ও অস্থিরতা বাড়ছে। এর ফলে কালবৈশাখী ধরনের ঝড় এবং বজ্রগর্ভ মেঘ বেশি তৈরি হচ্ছে। বনভূমি কমে যাওয়া, খোলা মাঠ বৃদ্ধি, উঁচু স্থাপনা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনও বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে হাওর অঞ্চল, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাত তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। কারণ এসব এলাকায় আর্দ্রতা বেশি এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাব প্রবল।

বজ্রপাত সম্পর্কে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এটি মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ নিতে পারে। খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, মাছ ধরা জেলে, স্কুল থেকে ফেরা শিশু, কিংবা শহরের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ—যে কেউ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

অনেকেই ভুল করে বৃষ্টির সময় বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেন। অথচ বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুতে আঘাত করে। তাই গাছের নিচে দাঁড়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। একইভাবে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা, টিনের ঘরে অবস্থান করা, নদী বা পুকুরে থাকা এবং হাতে লোহার বস্তু রাখা ঝুঁকি বাড়ায়।
বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে কিছু সহজ নিয়ম সবার জানা জরুরি।

আকাশে কালো মেঘ জমলে ও বিদ্যুৎ চমক দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ ভবন বা পাকা ঘরে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় মাঠে কাজ বন্ধ রাখা উচিত। খোলা ছাদ, বারান্দা, উঁচু জায়গা ও গাছের নিচ থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে। পুকুর, নদী বা জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। মোবাইল ফোন চার্জে লাগিয়ে ব্যবহার না করাই ভালো। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখাও নিরাপদ।
যদি কেউ খোলা মাঠে আটকে যান এবং আশেপাশে কোনো নিরাপদ ঘর না থাকে, তাহলে দুই পা কাছাকাছি রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে। তবে মাটিতে পুরো শুয়ে পড়া যাবে না। এতে বিদ্যুৎ শরীরে বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গ্রামের মানুষদের মধ্যে এখনো অনেক কুসংস্কার রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন বজ্রপাত “অভিশাপ” বা “অলৌকিক ঘটনা”। আসলে বজ্রপাত সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তাই ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা।

স্কুল, মসজিদ, বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ এবং গণমাধ্যমে বজ্রপাত বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণা বাড়ানো দরকার। কৃষক, জেলে ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য মৌসুমি সতর্কবার্তা সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। শহরের উঁচু ভবনে সঠিক লাইটনিং প্রটেকশন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, বজ্রপাত শুরু হওয়ার পর সচেতন হওয়ার চেয়ে আগেই সতর্ক হওয়া বেশি জরুরি। কারণ কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতাই একটি পরিবারের জন্য সারাজীবনের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রকৃতির এই শক্তিশালী ঘটনার সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, সচেতনতা ও সতর্কতার মাধ্যমেই নিরাপদ থাকা সম্ভব।

শোয়েব হোসেন(লেখক)
শিক্ষক,গবেষক,বিশ্লেষক,সামাজিক ও মানবিক কর্মী

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

কোনগুলো নিরাপদ আশ্রয়ে যান: বজ্রপাত থেকে বাঁচার বাস্তব নির্দেশনা

Update Time : ০৪:২৭:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বজ্রপাত উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আগে বছরে নির্দিষ্ট সময়ে বজ্রপাত বেশি দেখা গেলেও এখন প্রায় সব মৌসুমেই কোথাও না কোথাও বজ্রপাতের খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে গ্রামের খোলা মাঠ, হাওর অঞ্চল, নদীর পাড়, এমনকি শহরের উঁচু ভবনের এলাকাও এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। প্রতি বছর বহু মানুষ শুধুমাত্র অসচেতনতার কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ সামান্য সতর্কতা অনেক জীবন বাঁচাতে পারে।

বজ্রপাত মূলত আকাশের বিশাল বৈদ্যুতিক স্রোত। মেঘের মধ্যে পানি, বরফকণা ও বাতাসের সংঘর্ষে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়। সেই চার্জ হঠাৎ মেঘ থেকে মাটিতে বা এক মেঘ থেকে আরেক মেঘে ছুটে গেলে সৃষ্টি হয় বজ্রপাত। তখন প্রচণ্ড আলো ও বিকট শব্দ দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বাতাসে জলীয়বাষ্প ও অস্থিরতা বাড়ছে। এর ফলে কালবৈশাখী ধরনের ঝড় এবং বজ্রগর্ভ মেঘ বেশি তৈরি হচ্ছে। বনভূমি কমে যাওয়া, খোলা মাঠ বৃদ্ধি, উঁচু স্থাপনা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনও বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে হাওর অঞ্চল, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাত তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। কারণ এসব এলাকায় আর্দ্রতা বেশি এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাব প্রবল।

বজ্রপাত সম্পর্কে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এটি মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ নিতে পারে। খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, মাছ ধরা জেলে, স্কুল থেকে ফেরা শিশু, কিংবা শহরের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ—যে কেউ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

অনেকেই ভুল করে বৃষ্টির সময় বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেন। অথচ বজ্রপাত সাধারণত উঁচু বস্তুতে আঘাত করে। তাই গাছের নিচে দাঁড়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। একইভাবে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা, টিনের ঘরে অবস্থান করা, নদী বা পুকুরে থাকা এবং হাতে লোহার বস্তু রাখা ঝুঁকি বাড়ায়।
বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকতে কিছু সহজ নিয়ম সবার জানা জরুরি।

আকাশে কালো মেঘ জমলে ও বিদ্যুৎ চমক দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ ভবন বা পাকা ঘরে আশ্রয় নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় মাঠে কাজ বন্ধ রাখা উচিত। খোলা ছাদ, বারান্দা, উঁচু জায়গা ও গাছের নিচ থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে। পুকুর, নদী বা জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। মোবাইল ফোন চার্জে লাগিয়ে ব্যবহার না করাই ভালো। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগ খুলে রাখাও নিরাপদ।
যদি কেউ খোলা মাঠে আটকে যান এবং আশেপাশে কোনো নিরাপদ ঘর না থাকে, তাহলে দুই পা কাছাকাছি রেখে নিচু হয়ে বসতে হবে। তবে মাটিতে পুরো শুয়ে পড়া যাবে না। এতে বিদ্যুৎ শরীরে বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গ্রামের মানুষদের মধ্যে এখনো অনেক কুসংস্কার রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন বজ্রপাত “অভিশাপ” বা “অলৌকিক ঘটনা”। আসলে বজ্রপাত সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তাই ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা।

স্কুল, মসজিদ, বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ এবং গণমাধ্যমে বজ্রপাত বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণা বাড়ানো দরকার। কৃষক, জেলে ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য মৌসুমি সতর্কবার্তা সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। শহরের উঁচু ভবনে সঠিক লাইটনিং প্রটেকশন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, বজ্রপাত শুরু হওয়ার পর সচেতন হওয়ার চেয়ে আগেই সতর্ক হওয়া বেশি জরুরি। কারণ কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতাই একটি পরিবারের জন্য সারাজীবনের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রকৃতির এই শক্তিশালী ঘটনার সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, সচেতনতা ও সতর্কতার মাধ্যমেই নিরাপদ থাকা সম্ভব।

শোয়েব হোসেন(লেখক)
শিক্ষক,গবেষক,বিশ্লেষক,সামাজিক ও মানবিক কর্মী