০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টি-আর প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ’—প্রতিবাদ প্রকল্প সভাপতি এরশাদ আলমের

 

‘৭০০ ফুট কাজ শেষ, বাকি অংশও চলছে’—বর্ষা ও মাটির সংকটকে কাজ বন্ধের কারণ; অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তের দাবি –

মোঃ শহিদুল ইসলাম সিরাজগঞ্জঃ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ধুকুরিয়া বেড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদার মেটুয়ানি গ্রামের মাটির রাস্তা সংস্কারে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টি-আর) প্রকল্পের ২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর এবার এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্য এরশাদ আলম। তার দাবি, প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে টাকা আত্মসাতের অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এমন অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ।।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি সংবাদমাধ্যমে ‘রাস্তা সংস্কারে অনিয়ম, টি-আর প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর এ প্রতিবাদ আসে।

প্রকল্প সভাপতি এরশাদ আলম বলেন, ৯০০ ফুট দৈর্ঘ্যের রাস্তার পূর্ণ মেরামতের জন্য গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের পরামর্শ ক্রমে কাজ শুরু করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ ফুট রাস্তার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাস্তার বাকি অংশের মাটি সংগ্রহের স্থান বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবং মাটির সংকট তৈরি হওয়ায় প্রায় ২০০ ফুট কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

তার ভাষ্য, কাজ বন্ধ থাকার বিষয়টি গ্রামবাসীকে জানানো হয়েছিল এবং বর্ষা শেষে বাকি কাজ শেষ করার বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্প পরিদর্শনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে সরেজমিনে কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এরশাদ আলম বলেন, “বর্ষা ও মাটির সংকটের কারণে কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। এখন সেই সমস্যা দূর হয়েছে। বাকি কাজ চলমান রয়েছে এবং দু-একদিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।”

তবে প্রশ্ন উঠছে—যদি প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান থাকে, তাহলে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি কত শতাংশ এবং ইতোমধ্যে কত টাকা ব্যয় হয়েছে? বরাদ্দের পুরো অর্থের বিপরীতে প্রকৃত কাজের পরিমাণ কত? এসব তথ্য কি প্রকল্পের নথি ও মাপজোকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

প্রকল্পের সেক্রেটারি আলহাজ রইছ উদ্দিনও একই দাবি করেছেন। – তিনি বলেন, রাস্তার মাটি সংগ্রহের জন্য একটি স্থানে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপে ওই বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মাটি সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বর্ষা শেষে কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়।

তার দাবি, বর্তমানে মাটি সংগ্রহের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় বাকি কাজ আবার শুরু হয়েছে এবং দ্রুতই তা শেষ করা হবে।

শ্রমিকদের বক্তব্যেও মিলল কাজ চলার দাবি –
প্রকল্পে কাজ করা কয়েকজন শ্রমিকও রাস্তার কাজ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এক শ্রমিক বলেন, “২ লাখ টাকা বাজেটের কাজ চলছে। আমরা শুরু থেকেই এখানে কাজ করছি। যেখানে মাটি কাটতাম সেখানে পানি আসায় কাজ বন্ধ হয়েছিল। এখন আবার কাজ শুরু হয়েছে।”

আরেক শ্রমিক জানান, তারা প্রতিদিন ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মজনু মাস্টারের বাড়ি থেকে কালামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার একটি অংশে মাটি ফেলার কাজ করা হয়েছিল। পরে বর্ষায় মাটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে।

মো. আবু হানিফ নামে আরেক শ্রমিক বলেন, “আগে রাস্তা বাঁধার কাজ শুরু করেছিলাম। পানি বেড়ে যাওয়ায় কাজ স্থগিত ছিল। পানি কমার পর আবার কাজ শুরু করেছি।”

প্রয়োজনে মাটি সংগ্রহের জন্য কোথায় বাঁধ দেওয়া হয়েছিল, সেটিও দেখানো সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগের বিপরীতে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও কাজ চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. মজনু বলেন, তার বাড়ির সামনে থেকেই রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। বর্ষার কারণে কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল, বর্তমানে আবার কাজ চলমান।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, বর্ষার কারণে কাজ সাময়িক বন্ধ ছিল। একই সঙ্গে গ্রামে ব্যাক্তিগত একটি বিরোধের কারণে দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই বিরোধ থেকেই প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আরেক প্রতিবেশী বলেন, কিছুদিন কাজ করার পর বর্ষার কারণে রাস্তার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় গ্রামে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ ও মামলা হয় এবং এই প্রকল্পটির সেক্রেটারি আলহাজ্ব রইছ উদ্দিনের এন্ট্রি পক্ষ এরই জেরে প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগটি তুলেছেন। বর্তমানে বাকি কাজ আবার চলমান রয়েছে।

অন্য এক গ্রামবাসী বলেন, মজনু মাস্টারের বাড়ি থেকে হালিম ভাইয়ের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ শুরু হয়েছিল। বর্ষার কারণে কাজ বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবার কাজ শুরু হয়েছে।

তাহলে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কত?

এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন। একদিকে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি—২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ১৩/১৪ হাজার টাকার কাজ হয়েছে কাজ হয়েছে; অন্যদিকে প্রকল্প সভাপতি ও কয়েকজন শ্রমিকের দাবি—বর্ষার কারণে কাজ সাময়িক বন্ধ ছিল এবং এখন বাকি অংশের কাজ চলছে।

দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত সত্য নির্ধারণে প্রয়োজন প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, কাজের পরিমাণ, মাটি ফেলার পরিমাণ, শ্রমিকের হাজিরা, ব্যয়ের হিসাব, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির নথি এবং সরেজমিন মাপজোক।

বিশেষ করে ৯০০ ফুট রাস্তার কত ফুট কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কত ঘনফুট মাটি বা বালু ফেলার কথা ছিল, বাস্তবে কতটুকু ফেলা হয়েছে এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও বিল পরিশোধের সঙ্গে কাজের অগ্রগতির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই অভিযোগটির প্রকৃত ভিত্তি স্পষ্ট করতে পারে।

‘ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেই অভিযোগ’—প্রকল্প সভাপতির দাবি – এরশাদ আলম অভিযোগটিকে ব্যক্তিগত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত করে বলেন, প্রায় দুই মাস আগে গ্রামে একটি গোলযোগের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার জেরেই তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রকল্পের সেক্রেটারি রইছ উদ্দিনও একই ধরনের দাবি করেন। তার ভাষ্য, স্থানীয় বিরোধ ও মামলার জের ধরে প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত বিরোধের ফল হিসেবে দেখানো যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি প্রকল্প সভাপতির বক্তব্যকেও তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। প্রকল্পের সরকারি নথি ও সরেজমিন পরিমাপই পারে দুই পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করতে।

বিলের সময় ও অভিযোগের সময় নিয়েও প্রশ্ন –
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির দাবি, প্রকল্পের বিল-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার কয়েক মাস পর কেন এ ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তাদের প্রশ্ন—প্রকল্পের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়নি কেন? অভিযোগটি কখন করা হয়েছে, বিল কখন প্রস্তুত বা পরিশোধ হয়েছে এবং অভিযোগের সঙ্গে বিলের সময়ের সম্পর্ক কী—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।

তবে এর আগে অভিযোগের বিষয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান জানিয়েছিলেন, তালুকদার মেটুয়ানি গ্রামের রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে এলাকাবাসীর একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—প্রকল্পের কাগজপত্র, বরাদ্দ, বিল, মাপজোক ও বাস্তব কাজ সরেজমিনে যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।

কারণ প্রশ্নটি শুধু অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, সরকারি ২ লাখ টাকার প্রকল্পে অনুমোদিত কাজের পুরোটা বাস্তবে হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার বিপরীতে জনগণ কাঙ্ক্ষিত কাজ পেয়েছে কি না।

তদন্তের ফলই এখন নির্ধারণ করবে—এটি সত্যিই অনিয়মের ঘটনা, নাকি বর্ষা ও মাটির সংকটের কারণে সাময়িকভাবে থেমে যাওয়া একটি চলমান প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

টি-আর প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ’—প্রতিবাদ প্রকল্প সভাপতি এরশাদ আলমের

Update Time : ০৪:৩৪:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

‘৭০০ ফুট কাজ শেষ, বাকি অংশও চলছে’—বর্ষা ও মাটির সংকটকে কাজ বন্ধের কারণ; অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্তের দাবি –

মোঃ শহিদুল ইসলাম সিরাজগঞ্জঃ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ধুকুরিয়া বেড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তালুকদার মেটুয়ানি গ্রামের মাটির রাস্তা সংস্কারে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টি-আর) প্রকল্পের ২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠার পর এবার এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্য এরশাদ আলম। তার দাবি, প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে টাকা আত্মসাতের অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এমন অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ।।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি সংবাদমাধ্যমে ‘রাস্তা সংস্কারে অনিয়ম, টি-আর প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর এ প্রতিবাদ আসে।

প্রকল্প সভাপতি এরশাদ আলম বলেন, ৯০০ ফুট দৈর্ঘ্যের রাস্তার পূর্ণ মেরামতের জন্য গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের পরামর্শ ক্রমে কাজ শুরু করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ ফুট রাস্তার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে রাস্তার বাকি অংশের মাটি সংগ্রহের স্থান বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবং মাটির সংকট তৈরি হওয়ায় প্রায় ২০০ ফুট কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

তার ভাষ্য, কাজ বন্ধ থাকার বিষয়টি গ্রামবাসীকে জানানো হয়েছিল এবং বর্ষা শেষে বাকি কাজ শেষ করার বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। পরবর্তীতে প্রকল্প পরিদর্শনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে সরেজমিনে কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

এরশাদ আলম বলেন, “বর্ষা ও মাটির সংকটের কারণে কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। এখন সেই সমস্যা দূর হয়েছে। বাকি কাজ চলমান রয়েছে এবং দু-একদিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।”

তবে প্রশ্ন উঠছে—যদি প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান থাকে, তাহলে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি কত শতাংশ এবং ইতোমধ্যে কত টাকা ব্যয় হয়েছে? বরাদ্দের পুরো অর্থের বিপরীতে প্রকৃত কাজের পরিমাণ কত? এসব তথ্য কি প্রকল্পের নথি ও মাপজোকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

প্রকল্পের সেক্রেটারি আলহাজ রইছ উদ্দিনও একই দাবি করেছেন। – তিনি বলেন, রাস্তার মাটি সংগ্রহের জন্য একটি স্থানে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপে ওই বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় মাটি সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বর্ষা শেষে কাজ শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়।

তার দাবি, বর্তমানে মাটি সংগ্রহের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় বাকি কাজ আবার শুরু হয়েছে এবং দ্রুতই তা শেষ করা হবে।

শ্রমিকদের বক্তব্যেও মিলল কাজ চলার দাবি –
প্রকল্পে কাজ করা কয়েকজন শ্রমিকও রাস্তার কাজ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এক শ্রমিক বলেন, “২ লাখ টাকা বাজেটের কাজ চলছে। আমরা শুরু থেকেই এখানে কাজ করছি। যেখানে মাটি কাটতাম সেখানে পানি আসায় কাজ বন্ধ হয়েছিল। এখন আবার কাজ শুরু হয়েছে।”

আরেক শ্রমিক জানান, তারা প্রতিদিন ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মজনু মাস্টারের বাড়ি থেকে কালামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার একটি অংশে মাটি ফেলার কাজ করা হয়েছিল। পরে বর্ষায় মাটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে।

মো. আবু হানিফ নামে আরেক শ্রমিক বলেন, “আগে রাস্তা বাঁধার কাজ শুরু করেছিলাম। পানি বেড়ে যাওয়ায় কাজ স্থগিত ছিল। পানি কমার পর আবার কাজ শুরু করেছি।”

প্রয়োজনে মাটি সংগ্রহের জন্য কোথায় বাঁধ দেওয়া হয়েছিল, সেটিও দেখানো সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগের বিপরীতে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও কাজ চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. মজনু বলেন, তার বাড়ির সামনে থেকেই রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। বর্ষার কারণে কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল, বর্তমানে আবার কাজ চলমান।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, বর্ষার কারণে কাজ সাময়িক বন্ধ ছিল। একই সঙ্গে গ্রামে ব্যাক্তিগত একটি বিরোধের কারণে দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই বিরোধ থেকেই প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আরেক প্রতিবেশী বলেন, কিছুদিন কাজ করার পর বর্ষার কারণে রাস্তার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় গ্রামে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ ও মামলা হয় এবং এই প্রকল্পটির সেক্রেটারি আলহাজ্ব রইছ উদ্দিনের এন্ট্রি পক্ষ এরই জেরে প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগটি তুলেছেন। বর্তমানে বাকি কাজ আবার চলমান রয়েছে।

অন্য এক গ্রামবাসী বলেন, মজনু মাস্টারের বাড়ি থেকে হালিম ভাইয়ের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ শুরু হয়েছিল। বর্ষার কারণে কাজ বন্ধ থাকলেও বর্তমানে আবার কাজ শুরু হয়েছে।

তাহলে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কত?

এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন। একদিকে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি—২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ১৩/১৪ হাজার টাকার কাজ হয়েছে কাজ হয়েছে; অন্যদিকে প্রকল্প সভাপতি ও কয়েকজন শ্রমিকের দাবি—বর্ষার কারণে কাজ সাময়িক বন্ধ ছিল এবং এখন বাকি অংশের কাজ চলছে।

দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত সত্য নির্ধারণে প্রয়োজন প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, কাজের পরিমাণ, মাটি ফেলার পরিমাণ, শ্রমিকের হাজিরা, ব্যয়ের হিসাব, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির নথি এবং সরেজমিন মাপজোক।

বিশেষ করে ৯০০ ফুট রাস্তার কত ফুট কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কত ঘনফুট মাটি বা বালু ফেলার কথা ছিল, বাস্তবে কতটুকু ফেলা হয়েছে এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও বিল পরিশোধের সঙ্গে কাজের অগ্রগতির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই অভিযোগটির প্রকৃত ভিত্তি স্পষ্ট করতে পারে।

‘ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেই অভিযোগ’—প্রকল্প সভাপতির দাবি – এরশাদ আলম অভিযোগটিকে ব্যক্তিগত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত করে বলেন, প্রায় দুই মাস আগে গ্রামে একটি গোলযোগের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার জেরেই তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রকল্পের সেক্রেটারি রইছ উদ্দিনও একই ধরনের দাবি করেন। তার ভাষ্য, স্থানীয় বিরোধ ও মামলার জের ধরে প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্যকে শুধু ব্যক্তিগত বিরোধের ফল হিসেবে দেখানো যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি প্রকল্প সভাপতির বক্তব্যকেও তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। প্রকল্পের সরকারি নথি ও সরেজমিন পরিমাপই পারে দুই পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করতে।

বিলের সময় ও অভিযোগের সময় নিয়েও প্রশ্ন –
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির দাবি, প্রকল্পের বিল-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার কয়েক মাস পর কেন এ ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

তাদের প্রশ্ন—প্রকল্পের কাজ চলমান থাকা অবস্থায় কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়নি কেন? অভিযোগটি কখন করা হয়েছে, বিল কখন প্রস্তুত বা পরিশোধ হয়েছে এবং অভিযোগের সঙ্গে বিলের সময়ের সম্পর্ক কী—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।

তবে এর আগে অভিযোগের বিষয়ে বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান জানিয়েছিলেন, তালুকদার মেটুয়ানি গ্রামের রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে এলাকাবাসীর একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—প্রকল্পের কাগজপত্র, বরাদ্দ, বিল, মাপজোক ও বাস্তব কাজ সরেজমিনে যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।

কারণ প্রশ্নটি শুধু অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, সরকারি ২ লাখ টাকার প্রকল্পে অনুমোদিত কাজের পুরোটা বাস্তবে হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার বিপরীতে জনগণ কাঙ্ক্ষিত কাজ পেয়েছে কি না।

তদন্তের ফলই এখন নির্ধারণ করবে—এটি সত্যিই অনিয়মের ঘটনা, নাকি বর্ষা ও মাটির সংকটের কারণে সাময়িকভাবে থেমে যাওয়া একটি চলমান প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ।