১১:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভবদহের জলাবদ্ধ জমিতে মাছ চাষে ভাগ্য বদল এম এ হালিমের

 

মাসুদ রায়হান স্টাফ রিপোর্টার।

পতিত জমি থেকে আয়, কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার নতুন দৃষ্টান্ত
এস এম তাজাম্মুল, মণিরামপুর:
ভবদহের জলাবদ্ধতায় বছরের পর বছর ফসল ফলানো যেত না। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পড়ে থাকত পানির নিচে। জমির মালিকদের কাছে এসব জমি একসময় হয়ে উঠেছিল বোঝা। সেই পতিত জমিকেই লিজ নিয়ে মাছের ঘের তৈরি করে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি জমির মালিকদের জন্যও আয়ের নতুন পথ তৈরি করেছেন যশোরের মণিরামপুরের সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী এম এ হালিম। ২০০৭ সালে শুরু করা তাঁর এ উদ্যোগ প্রায় দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতাকবলিত এলাকায় কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ভবদহ তীরবর্তী এলাকার মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। ১৯৯০-এর দশক থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বিল কপালিয়া, বিল খুকশিয়া, বিল আড়পাতা, বিল কেদারিয়াসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার জমিতে নিয়মিত ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আসছে। বছরের পর বছর জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় কৃষিনির্ভর বহু পরিবার পড়েছিল চরম অনিশ্চয়তায়।
এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবহারের পথ খুঁজে নেন এম এ হালিম। ২০০৭ সালের শুরুর দিকে ভবদহ তীরবর্তী খানপুর ও কুলটিয়া ইউনিয়নের বিল শালিকার পতিত জমির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। জলাবদ্ধতার কারণে যেসব জমিতে ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছিল না, সেসব জমি লিজ নিয়ে সেখানে মাছের খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি।
জমির মালিকদের সম্মতিতে নির্দিষ্ট হারে জমি লিজ নিয়ে ডিট তৈরি করে শুরু করেন বাণিজ্যিক মৎস্য চাষ। সময়ের সঙ্গে তাঁর সেই উদ্যোগ বড় পরিসরে রূপ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য চাষ করে নিজে যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি তাঁর লিজ নেওয়া জমির মালিকরাও নিয়মিত আয়ের সুযোগ পেয়েছেন।
জমির মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন তাঁদের জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এম এ হালিম জমি লিজ নেওয়ার পর সেই জমি থেকেই নিয়মিত আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যে জমি একসময় কোনো কাজে আসত না, সেটিই এখন পরিবারের খরচ চালানোর অন্যতম ভরসা।
স্থানীয় শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে পতিত জমি লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য খামারে পরিণত করার ক্ষেত্রে এম এ হালিমের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে আলাদা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একসময় যে জমি ছিল ফসলহীন এবং যে জল ছিল দুর্ভোগের প্রতীক, সেই জমি ও জলকেই কাজে লাগিয়ে তিনি পরিবর্তনের গল্প লিখেছেন।
খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এম এ হালিমের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দিক হলো—তিনি জলাবদ্ধতার কারণে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়া জমিকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর লিজ নেওয়া জমিতে মাছ চাষের ফলে একদিকে জমির মালিকরা আয় পাচ্ছেন, অন্যদিকে মৎস্য খামারকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, জলাবদ্ধ এলাকার অনাবাদি জমিকে পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষে ব্যবহার করা গেলে তা স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে চাষি এম এ হালিমের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন বলেন, মণিরামপুরের মৎস্য সম্পদ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আত্মকর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা সৃষ্টিতে মাছ চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের নানা উদ্যোগের মাধ্যমে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এম এ হালিম বলেন, “জলাবদ্ধতার কারণে বছরের পর বছর জমি পড়ে থাকলে কৃষকের যেমন ক্ষতি, দেশেরও তেমনি ক্ষতি। তাই পতিত জমিকে মৎস্য চাষের আওতায় এনে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি জমির মালিকরাও উপকৃত হচ্ছেন—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
ভবদহের জলাবদ্ধতা হয়তো এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে সেই জলাবদ্ধতার মধ্যেই সম্ভাবনার পথ খুঁজে নিয়ে এম এ হালিম দেখিয়েছেন—পতিত জমিও হতে পারে আয়ের উৎস, জলও হতে পারে জীবিকার মাধ্যম। তাঁর দীর্ঘদিনের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

ভবদহের জলাবদ্ধ জমিতে মাছ চাষে ভাগ্য বদল এম এ হালিমের

Update Time : ০৫:৪৬:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

মাসুদ রায়হান স্টাফ রিপোর্টার।

পতিত জমি থেকে আয়, কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার নতুন দৃষ্টান্ত
এস এম তাজাম্মুল, মণিরামপুর:
ভবদহের জলাবদ্ধতায় বছরের পর বছর ফসল ফলানো যেত না। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পড়ে থাকত পানির নিচে। জমির মালিকদের কাছে এসব জমি একসময় হয়ে উঠেছিল বোঝা। সেই পতিত জমিকেই লিজ নিয়ে মাছের ঘের তৈরি করে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি জমির মালিকদের জন্যও আয়ের নতুন পথ তৈরি করেছেন যশোরের মণিরামপুরের সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী এম এ হালিম। ২০০৭ সালে শুরু করা তাঁর এ উদ্যোগ প্রায় দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতাকবলিত এলাকায় কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ভবদহ তীরবর্তী এলাকার মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। ১৯৯০-এর দশক থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বিল কপালিয়া, বিল খুকশিয়া, বিল আড়পাতা, বিল কেদারিয়াসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার জমিতে নিয়মিত ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আসছে। বছরের পর বছর জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় কৃষিনির্ভর বহু পরিবার পড়েছিল চরম অনিশ্চয়তায়।
এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবহারের পথ খুঁজে নেন এম এ হালিম। ২০০৭ সালের শুরুর দিকে ভবদহ তীরবর্তী খানপুর ও কুলটিয়া ইউনিয়নের বিল শালিকার পতিত জমির মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। জলাবদ্ধতার কারণে যেসব জমিতে ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছিল না, সেসব জমি লিজ নিয়ে সেখানে মাছের খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি।
জমির মালিকদের সম্মতিতে নির্দিষ্ট হারে জমি লিজ নিয়ে ডিট তৈরি করে শুরু করেন বাণিজ্যিক মৎস্য চাষ। সময়ের সঙ্গে তাঁর সেই উদ্যোগ বড় পরিসরে রূপ নেয়। দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য চাষ করে নিজে যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি তাঁর লিজ নেওয়া জমির মালিকরাও নিয়মিত আয়ের সুযোগ পেয়েছেন।
জমির মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন তাঁদের জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এম এ হালিম জমি লিজ নেওয়ার পর সেই জমি থেকেই নিয়মিত আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যে জমি একসময় কোনো কাজে আসত না, সেটিই এখন পরিবারের খরচ চালানোর অন্যতম ভরসা।
স্থানীয় শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে পতিত জমি লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য খামারে পরিণত করার ক্ষেত্রে এম এ হালিমের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে আলাদা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একসময় যে জমি ছিল ফসলহীন এবং যে জল ছিল দুর্ভোগের প্রতীক, সেই জমি ও জলকেই কাজে লাগিয়ে তিনি পরিবর্তনের গল্প লিখেছেন।
খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এম এ হালিমের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দিক হলো—তিনি জলাবদ্ধতার কারণে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়া জমিকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর লিজ নেওয়া জমিতে মাছ চাষের ফলে একদিকে জমির মালিকরা আয় পাচ্ছেন, অন্যদিকে মৎস্য খামারকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, জলাবদ্ধ এলাকার অনাবাদি জমিকে পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষে ব্যবহার করা গেলে তা স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে চাষি এম এ হালিমের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেন বলেন, মণিরামপুরের মৎস্য সম্পদ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আত্মকর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা সৃষ্টিতে মাছ চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের নানা উদ্যোগের মাধ্যমে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এম এ হালিম বলেন, “জলাবদ্ধতার কারণে বছরের পর বছর জমি পড়ে থাকলে কৃষকের যেমন ক্ষতি, দেশেরও তেমনি ক্ষতি। তাই পতিত জমিকে মৎস্য চাষের আওতায় এনে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি জমির মালিকরাও উপকৃত হচ্ছেন—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
ভবদহের জলাবদ্ধতা হয়তো এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তবে সেই জলাবদ্ধতার মধ্যেই সম্ভাবনার পথ খুঁজে নিয়ে এম এ হালিম দেখিয়েছেন—পতিত জমিও হতে পারে আয়ের উৎস, জলও হতে পারে জীবিকার মাধ্যম। তাঁর দীর্ঘদিনের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।