
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
ব্যবসায়িক পরিচয়,রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংগঠনিক ক্ষমতা,এই তিন বলয়ের সমন্বয়ে সিরাজগঞ্জে সাইদুর রহমান বাচ্চু ওরফে বিকাশ বাচ্চুর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের প্রশ্ন ও অভিযোগ রয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়,একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিরাজগঞ্জ জেলায় টেন্ডারবাজি,ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগের পাশাপাশি তার বিপুল সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এখানে বড় প্রশ্ন হলো,বৈধ ব্যবসা বা দৃশ্যমান বৈধ আয়ের নির্ভরযোগ্য উৎস না থাকলে এত বিপুল সম্পদের মালিক হয় কীভাবে?
অভিযোগকারীদের দাবি,ব্যবসায়ী সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন কৌশলে অর্থ আদায়ই ছিল তার অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম উৎস। তাদের ভাষ্যমতে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ও সাংগঠনিক ক্ষমতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পায়না। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সম্পদ বিবরণী,আয়কর নথি,ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট,ব্যবসায়ীদের লিখিত অভিযোগ যাচাই করা জরুরি। ‘শতকোটি টাকার মালিক’সম্পদের উৎস কোথায়?
স্থানীয় পর্যায়ে বাচ্চুর সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও শতকোটি টাকার সম্পদের নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না,সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন,দৃশ্যমান বৈধ ব্যবসা ছাড়াই তার সম্পদ ও প্রভাবের বিস্তার ঘটেছে। তাদের প্রশ্ন,আয়ের উৎস যদি বৈধ ও স্বচ্ছ হয়,তাহলে সেই সম্পদের উৎস, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হিসাব এবং আয়কর নথি জনসমক্ষে আনতে আপত্তি কোথায়?
তবে অভিযোগের ভিত্তি যাচাই ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট সম্পদের পরিমাণ বা অর্থের উৎসকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দাবি করা যাবে না। তবে কি ব্যবসায়ী নাকি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রক?
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃত্বে আসার পর থেকে বাচ্চুর ব্যবসায়িক প্রভাব আরোও দৃশ্যমান হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাকে চেম্বারের সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে,ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ী মহলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ কারীরা জানান।
বাচ্চুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি,টেন্ডারবাজি এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের সাথে তার নাম জড়ানো হলেও এসব অভিযোগের কোন মামলা বা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কিনা তা পৃথকভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘সেল্টার’দেওয়ার অভিযোগ ও বাচ্চুকে ঘিরে আরোও একটি রাজনৈতিক অভিযোগ রয়েছে ,ক্ষমতার পালাবদলের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের নিরাপদ আশ্রয় বা রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেন, কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের ‘সেল্টার’ দেওয়ার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। এমনকি রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে নিজ দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদেরও অবমূল্যায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগও রয়েছে বাচ্চুর বিরুদ্ধে। তবে অর্থ লেনদেনের নির্দিষ্ট অঙ্ক,ব্যাংক হিসাব, সম্পদ হস্তান্তর বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা বলা যায় না। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথির অনুসন্ধান একান্ত প্রয়োজন।
খালেদা জিয়ার আদর্শের রাজনীতি,নাকি সুবিধাবাদী রাজনীতি। তবে বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং দলীয় আদর্শের সঙ্গে বাচ্চুর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য,সারা জীবন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শের কথা বলা হলেও বাস্তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হলে সেটি দলীয় আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন,বিএনপি’র স্থানীয় নেতাকর্মীরা। মাঠ পর্যায়ে বিএনপির নেতা কর্মীরা মনে করেন,
এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সত্য হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে মাঠপর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের। দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে থাকা কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন—দলের কঠিন সময়ে যারা পাশে ছিলেন,তাদের বাদ দিয়ে ক্ষমতাবান ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে কেন?‘১৫ পুলিশ নিহত না হলে পুলিশের মেরুদণ্ড ভাঙত না’বাচ্চুকে ঘিরে সবচেয়ে বিস্ফোরক বিতর্ক তৈরি হয় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে মিল্কভিটার এক মতবিনিময় সভায় বাচ্চুর দেওয়া বক্তব্যের ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে যদি ১৫ জন পুলিশ নিহত না হতো,তাহলে বাংলাদেশের পুলিশের মেরুদণ্ড ভাঙত না। আমরা সিরাজগঞ্জে আন্দোলন করে,বাংলাদেশের পুলিশের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে,২০২৪ সালের আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছি।”তৎকালীন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এনায়েতপুর থানায় হামলা,অগ্নিসংযোগ ও ১৫ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল ভয়াবহ সহিংসতার অন্যতম ঘটনা। তার এই বক্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে বাচ্চু দাবি করেন,বক্তব্যটি এডিট করা হয়েছিল;অন্য এক প্রতিবেদনে তার বক্তব্যকে ‘স্লিপ অব টাং’বা মুখ ফসকে বলা কথা হিসেবে দুঃখ প্রকাশের কথাও এসেছে। তবে বক্তব্যটির পূর্ণ ভিডিও,প্রেক্ষাপট এবং এনায়েতপুরের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও মামলার নথি থেকেই আসতে হবে। অভিযোগের স্তূপ,জবাবদিহি কোথায়? চাঁদাবাজি থেকে টেন্ডারবাজি,ব্যবসায়ীদের জিম্মি করার অভিযোগ থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো,বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে বাচ্চুকে ঘিরে প্রশ্নের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
এখন মূল প্রশ্ন একটাই—জিরো থেকে হিরো বাচ্চু’র বৈধ আয়ের উৎস কী? সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ কত? প্রকৃত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড কোথায়? কার কাছ থেকে কী পরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে,এগুলোর হিসাব কোথায়? টেন্ডার ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে তার রাজনৈতিক প্রভাব কতটা ব্যবহৃত হয়েছে? আর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাদের পুনর্বাসনের অভিযোগের পেছনে আদৌ কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়—প্রয়োজন নথি,আয়কর বিবরণী,ব্যাংক হিসাব,সম্পদ বিবরণী,মামলার এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি করেন, স্থানীয় বিএনপির তৃণমূলের নেতা কর্মীরা।
কারণ,একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু অভিযোগ যখন চাঁদাবাজি,টেন্ডারবাজি,ভয়ভীতি, অবৈধ সম্পদ ও রাজনৈতিক আশ্রয়-বাণিজ্যের মতো গুরুতর বিষয়ে গড়ায়,তখন নীরবতা নয়—জবাবদিহিই হওয়া উচিত হবে বলে দাবি করেন সচেতন মহল।
এ সকল অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বাচ্চু’র সাথে একাধিক বার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধির নাম 



















