১১:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের চৌগাছা উপজেলার পিআইও ৫%’কমিশন ও কাজ ছাড়াই বিল পাশের অভিযোগ সামসুন নাহারের বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক

যশোরের চৌগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সামসুন নাহারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্প শেষ না করেই ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিদের বিল ছাড়করণে সহায়তার বিনিময়ে তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অফিসে তিনি ‘মিস ৫%’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে উপজেলায়।

চলতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজিবর ‘তিলকপুর একছের মিয়ার বাড়ি থেকে মতিয়ারের জমি পর্যন্ত’ কাঁচা রাস্তা তৈরির জন্য ৪ টন গম বরাদ্দ পান।

তবে কোনো কাজ না করেই গত জুন মাসে পিআইও সামসুন নাহারের মদদে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়।একইভাবে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন রাস্তার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তরিকুল রাস্তা মেরামতের বরাদ্দকৃত ৪ টন চাল কোনো কাজ না করেই উত্তোলন করে নেন।

বিষয়টি জানাজানি হলে সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট তিন ইউপি সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।

সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তারা আগামী সাত দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

পরবর্তীতে তারা লোকদেখানো ও নিম্নমানের কাজ সম্পন্ন করেন।

এ অনিয়মের বিষয়ে সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লক সুপারভাইজার (উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা) আমিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনিও সত্যতা নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, পুরো বিষয়টি পিআইও সামসুন নাহার সরাসরি জানতেন। আমিরুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানালে পিআইও তার সঙ্গে অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেন।

এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে, যেখানে আমিরুল ইসলামকে অনিয়মের পুরো প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে শোনা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিআইও অফিসের এক কর্মচারী জানান, পিআইও ম্যাডামের কাছ থেকে কাজ আদায় করতে হলে তার পাওনা’ আগে বুঝিয়ে দিতে হয়।

উনার পার্সেন্টেজ পেলেই হলো, মাঠ পর্যায়ে কাজ ঠিকমতো হলো কি না, তা উনি দেখেন না।

উপজেলার এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টাকা ছাড়া ম্যাডাম কোনো ফাইল সই করেন না।

আমরা ঘুষ দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু উনার চাহিদার হার অনেক বেশি। এমন চললে কাজ করব নাকি উনাকে কমিশন দেব?

কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সামসুন নাহার সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া গল্প।

অভিযোগের বিষয়ে পিআইও-র সাথে যোগাযোগের পরপরই তথ্য সংগ্রহকারী সংবাদকর্মীকে ঝিকরগাছা বিএনপির এক নেতা ফোন করে চাপ সৃষ্টি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, কাজ বাস্তবায়ন না করে বিল পাসের সুযোগ নেই, এটি চরম অন্যায়।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

চৌগাছায় পিআইও সামসুন নাহারের বিরুদ্ধে ওঠা কমিশন বাণিজ্য ও ভুয়া বিল পাসের গুরুতর অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি রাখে।

উপজেলা প্রশাসন ও জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

যশোরের চৌগাছা উপজেলার পিআইও ৫%’কমিশন ও কাজ ছাড়াই বিল পাশের অভিযোগ সামসুন নাহারের বিরুদ্ধে

Update Time : ০৫:১৬:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

যশোরের চৌগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সামসুন নাহারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্প শেষ না করেই ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিদের বিল ছাড়করণে সহায়তার বিনিময়ে তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অফিসে তিনি ‘মিস ৫%’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে উপজেলায়।

চলতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজিবর ‘তিলকপুর একছের মিয়ার বাড়ি থেকে মতিয়ারের জমি পর্যন্ত’ কাঁচা রাস্তা তৈরির জন্য ৪ টন গম বরাদ্দ পান।

তবে কোনো কাজ না করেই গত জুন মাসে পিআইও সামসুন নাহারের মদদে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়।একইভাবে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন রাস্তার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তরিকুল রাস্তা মেরামতের বরাদ্দকৃত ৪ টন চাল কোনো কাজ না করেই উত্তোলন করে নেন।

বিষয়টি জানাজানি হলে সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট তিন ইউপি সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।

সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তারা আগামী সাত দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

পরবর্তীতে তারা লোকদেখানো ও নিম্নমানের কাজ সম্পন্ন করেন।

এ অনিয়মের বিষয়ে সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লক সুপারভাইজার (উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা) আমিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনিও সত্যতা নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, পুরো বিষয়টি পিআইও সামসুন নাহার সরাসরি জানতেন। আমিরুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানালে পিআইও তার সঙ্গে অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেন।

এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে, যেখানে আমিরুল ইসলামকে অনিয়মের পুরো প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে শোনা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিআইও অফিসের এক কর্মচারী জানান, পিআইও ম্যাডামের কাছ থেকে কাজ আদায় করতে হলে তার পাওনা’ আগে বুঝিয়ে দিতে হয়।

উনার পার্সেন্টেজ পেলেই হলো, মাঠ পর্যায়ে কাজ ঠিকমতো হলো কি না, তা উনি দেখেন না।

উপজেলার এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টাকা ছাড়া ম্যাডাম কোনো ফাইল সই করেন না।

আমরা ঘুষ দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু উনার চাহিদার হার অনেক বেশি। এমন চললে কাজ করব নাকি উনাকে কমিশন দেব?

কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সামসুন নাহার সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া গল্প।

অভিযোগের বিষয়ে পিআইও-র সাথে যোগাযোগের পরপরই তথ্য সংগ্রহকারী সংবাদকর্মীকে ঝিকরগাছা বিএনপির এক নেতা ফোন করে চাপ সৃষ্টি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, কাজ বাস্তবায়ন না করে বিল পাসের সুযোগ নেই, এটি চরম অন্যায়।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

চৌগাছায় পিআইও সামসুন নাহারের বিরুদ্ধে ওঠা কমিশন বাণিজ্য ও ভুয়া বিল পাসের গুরুতর অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি রাখে।

উপজেলা প্রশাসন ও জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।