
মোস্তাক আহমেদ (বাবু) রংপুর।
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি। বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। ভেতরে নিস্তব্ধতা। কয়েক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় স্বজনদের সন্দেহ। পরে দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করতেই একে একে মিলল একই পরিবারের চারজনের মরদেহ।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তান—চারজনের মরদেহ বাড়ির ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়। ছাদে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ, সিঁড়ির অংশে স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ এবং একটি কক্ষের খাটের নিচে ছেলের মরদেহ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় বাড়ির বিভিন্ন স্থানে জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার তথ্য উঠে আসে। অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী রাখার সম্ভাব্য স্থানগুলো তছনছ অবস্থায় ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে জানান। পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ডাকাতির সম্ভাবনাও সামনে আসে। তবে স্বজনদের কেউ কেউ শুরু থেকেই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
লাশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন।
একই বাড়িতে চারজনের মরদেহ চার ধরনের অবস্থানে পাওয়া যাওয়ার ঘটনাটি শুরু থেকেই আলোচনার জন্ম দেয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, চারটি মরদেহ বাড়ির আলাদা আলাদা স্থানে ছিল। তদন্তে এসব অবস্থানের সঙ্গে ঘটনার সম্ভাব্য সময়, হত্যার ধরন এবং অভিযুক্তদের চলাচলের বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে নানা আলামত সংগ্রহ করা হয়। নিহতদের মুখমণ্ডলে পোড়ার চিহ্ন থাকার কথাও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
স্বর্ণালংকার ও লুটপাটের প্রশ্ন
ঘটনার পর স্বর্ণালংকার চুরি হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে কী পরিমাণ—এ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিছু স্বর্ণালংকার উদ্ধারের কথা। অন্যদিকে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত ও মূল্যবান সামগ্রীর পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তবে ঠিক কী কী সামগ্রী খোয়া গেছে, কতটুকু স্বর্ণালংকার ছিল এবং ঘটনার সঙ্গে লুটপাটের সম্পর্ক কতটা—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো তদন্তের মধ্যেই রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বদলেছে তদন্তের দায়িত্ব
ঘটনার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব কোতোয়ালি থানা থেকে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গ্রেপ্তার দুজনের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি তদন্তকারীরা ঘটনার সময়, আলামত এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক বিষয়ও খতিয়ে দেখছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে। এ জন্য প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আলামতের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা হবে।
তদন্তে পূর্ণ সত্য বেরিয়ে আসার দাবি
একই পরিবারের চারজনের এমন মৃত্যুতে রংপুরজুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন। স্বজন, এলাকাবাসী, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনার গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের প্রশ্ন—ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আলামত, চারজনের মরদেহের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক নানা তথ্য মিলিয়ে প্রকৃতপক্ষে সেদিন কী ঘটেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের হাতে। আর সেই তদন্তের দিকেই তাকিয়ে নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর স্বজনসহ রংপুরবাসী।
মোস্তাক আহমেদ (বাবু) রংপুর ।
প্রতিনিধির নাম 



















