০৭:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সংকটে চট্টগ্রামের ৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ; উৎপাদন কমেছে আরো ৭টিতে

 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। এ অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। আরো সাতটি কেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ফলে কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি থাকলেও বাস্তবে চট্টগ্রামজুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় এক ঘণ্টাও টানা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানির সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২৮টি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াটের কাপ্তাই সোলার, ২১০ মেগাওয়াট করে রাউজান-১ ও রাউজান-২, ২০ মেগাওয়াটের টেকনাফ সোলার এবং ৫০ মেগাওয়াটের ইউনাইটেড পাওয়ার।
এ ছাড়া সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ১১৬ মেগাওয়াটের আনলিমা এনার্জি, ৩০০ মেগাওয়াটের আনোয়ারা ইউনাইটেড, ৫০ মেগাওয়াটের বারাকা, বারাকা কর্ণফুলী, জুলদা-১, জুলদা-২ এবং ৫৪ মেগাওয়াটের জুডিয়াক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
তবে পিডিবির দাবি, চট্টগ্রামে বর্তমানে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। সংস্থাটির হিসাবে, পিক আওয়ারে চাহিদা ১ হাজার ৬৮ দশমিক ৭৯ মেগাওয়াট এবং সরবরাহও সমপরিমাণ। অফ-পিক সময়ে চাহিদা ৯৫৮ দশমিক ৮৭ মেগাওয়াট, সরবরাহও একই পরিমাণ। ফলে কাগজে-কলমে লোডশেডিং শূন্য।
বাস্তব চিত্র অবশ্য ভিন্ন। বুধবার নগরীর রসুলবাগ আবাসিক এলাকায় সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। স্থানীয়দের অভিযোগ, পিডিবির হিসাবে শূন্য মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখানো হলেও বাস্তবে ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াটের বেশি। একইভাবে পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা-ইপিজেড ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে।
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্পকারখানা। বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। জেনারেটর চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ফ্ল্যাটবাড়ি ও বড় অফিসগুলোকে।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ উৎপাদনে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরদিন থেকে গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
সিইউএফএল চালু রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় কারখানাটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি এক হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারীর জীবন-জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিইউএফএলের উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সমীরন মারমা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে ৪ মার্চ থেকে সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তবে চলতি মাসের শেষের দিকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করা না হলে চট্টগ্রামের আরো কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন, নগরজীবন ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

জ্বালানি সংকটে চট্টগ্রামের ৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ; উৎপাদন কমেছে আরো ৭টিতে

Update Time : ০২:১৮:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। এ অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। আরো সাতটি কেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ফলে কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি থাকলেও বাস্তবে চট্টগ্রামজুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় এক ঘণ্টাও টানা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানির সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ২৮টি বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে ছয়টি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াটের কাপ্তাই সোলার, ২১০ মেগাওয়াট করে রাউজান-১ ও রাউজান-২, ২০ মেগাওয়াটের টেকনাফ সোলার এবং ৫০ মেগাওয়াটের ইউনাইটেড পাওয়ার।
এ ছাড়া সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ১১৬ মেগাওয়াটের আনলিমা এনার্জি, ৩০০ মেগাওয়াটের আনোয়ারা ইউনাইটেড, ৫০ মেগাওয়াটের বারাকা, বারাকা কর্ণফুলী, জুলদা-১, জুলদা-২ এবং ৫৪ মেগাওয়াটের জুডিয়াক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
তবে পিডিবির দাবি, চট্টগ্রামে বর্তমানে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। সংস্থাটির হিসাবে, পিক আওয়ারে চাহিদা ১ হাজার ৬৮ দশমিক ৭৯ মেগাওয়াট এবং সরবরাহও সমপরিমাণ। অফ-পিক সময়ে চাহিদা ৯৫৮ দশমিক ৮৭ মেগাওয়াট, সরবরাহও একই পরিমাণ। ফলে কাগজে-কলমে লোডশেডিং শূন্য।
বাস্তব চিত্র অবশ্য ভিন্ন। বুধবার নগরীর রসুলবাগ আবাসিক এলাকায় সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। স্থানীয়দের অভিযোগ, পিডিবির হিসাবে শূন্য মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখানো হলেও বাস্তবে ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াটের বেশি। একইভাবে পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা-ইপিজেড ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে।
বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্পকারখানা। বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। জেনারেটর চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ফ্ল্যাটবাড়ি ও বড় অফিসগুলোকে।
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ উৎপাদনে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরদিন থেকে গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
সিইউএফএল চালু রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় কারখানাটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি এক হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারীর জীবন-জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিইউএফএলের উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সমীরন মারমা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে ৪ মার্চ থেকে সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তবে চলতি মাসের শেষের দিকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করা না হলে চট্টগ্রামের আরো কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন, নগরজীবন ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।