০৮:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টুঙ্গিপাড়ায় পানিতে ডুবেছে ঘরবাড়ি, কবরস্থান, রান্নাঘর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, রান্না বন্ধ—সাপের আতঙ্কে রাত কাটছে

মোঃ শিহাব উদ্দিন গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা এবার চরম আকার ধারণ করেছে। টানা বৃষ্টিতে গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বসতঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, উঠান, সড়ক ও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুম এলেই এ গ্রামের নিম্নাঞ্চলে পানি জমে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এবার টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
গ্রামের অনেক বাড়ির রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চুলা জ্বালাতে পারছেন না বাসিন্দারা। এতে অনেক পরিবার একবেলা খেয়ে দিন পার করছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সামসুরনাহার বলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। জলাবদ্ধতার কারণে ঘরের ভেতরে পানি উঠে গেছে। রান্না করা, খাওয়া কিংবা বাথরুম ব্যবহার—কোনোটাই স্বাভাবিকভাবে করা যাচ্ছে না। আমরা এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চাই।’
রফিক শেখ, ইসুব শেখ, নেয়ামত শেখ, শহীদ ফকির, মসিউর শেখ, ফরিদ মোল্লা, শামসুল হক শেখ ও লক্ষণ সাহাসহ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কাঠ বা অন্যান্য জ্বালানি দিয়ে রান্না করেন। কিন্তু রান্নাঘর পানিতে ডুবে থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বাথরুমও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
তাঁদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও সেপটিক ট্যাংকের ময়লা পানিতে মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাতে সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
কবরস্থানও পানিতে তলিয়ে গেছে
জলাবদ্ধতার কারণে গ্রামের কবরস্থানও পানিতে তলিয়ে গেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
একজন বাসিন্দা বলেন, ‘মানুষ মারা যাওয়ার পর অন্তত শান্তিতে থাকার কথা। কিন্তু আমাদের এখানে একটু বৃষ্টি হলেই কবরস্থান পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম সবকিছু তলিয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে সমস্যা চলছে। প্রতিশ্রুতি পেলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাটগাতী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত মধ্যপাড়া গ্রামে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। গ্রামে কবরস্থান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও গণশিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে।
পানি অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে
পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পানি নিষ্কাশনের নির্দেশ দিয়েছেন। দ্রুত পানি অপসারণের কাজ শুরু করা হবে।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিদারুল আলম বলেন, ‘টুঙ্গিপাড়া নিচু এলাকা হওয়ায় ভারী বৃষ্টি হলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি জানার পর জরুরি ভিত্তিতে পানি অপসারণের জন্য প্যানেল চেয়ারম্যান ও পৌরসভার প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাঁদের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি বন্ধে দ্রুত স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হোক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

টুঙ্গিপাড়ায় পানিতে ডুবেছে ঘরবাড়ি, কবরস্থান, রান্নাঘর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় পানিবন্দী শতাধিক পরিবার, রান্না বন্ধ—সাপের আতঙ্কে রাত কাটছে

Update Time : ০৪:৩৫:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

মোঃ শিহাব উদ্দিন গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা এবার চরম আকার ধারণ করেছে। টানা বৃষ্টিতে গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বসতঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, উঠান, সড়ক ও কবরস্থান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুম এলেই এ গ্রামের নিম্নাঞ্চলে পানি জমে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এবার টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
গ্রামের অনেক বাড়ির রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চুলা জ্বালাতে পারছেন না বাসিন্দারা। এতে অনেক পরিবার একবেলা খেয়ে দিন পার করছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সামসুরনাহার বলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। জলাবদ্ধতার কারণে ঘরের ভেতরে পানি উঠে গেছে। রান্না করা, খাওয়া কিংবা বাথরুম ব্যবহার—কোনোটাই স্বাভাবিকভাবে করা যাচ্ছে না। আমরা এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চাই।’
রফিক শেখ, ইসুব শেখ, নেয়ামত শেখ, শহীদ ফকির, মসিউর শেখ, ফরিদ মোল্লা, শামসুল হক শেখ ও লক্ষণ সাহাসহ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কাঠ বা অন্যান্য জ্বালানি দিয়ে রান্না করেন। কিন্তু রান্নাঘর পানিতে ডুবে থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বাথরুমও ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
তাঁদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও সেপটিক ট্যাংকের ময়লা পানিতে মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাতে সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
কবরস্থানও পানিতে তলিয়ে গেছে
জলাবদ্ধতার কারণে গ্রামের কবরস্থানও পানিতে তলিয়ে গেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
একজন বাসিন্দা বলেন, ‘মানুষ মারা যাওয়ার পর অন্তত শান্তিতে থাকার কথা। কিন্তু আমাদের এখানে একটু বৃষ্টি হলেই কবরস্থান পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, বাথরুম সবকিছু তলিয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে সমস্যা চলছে। প্রতিশ্রুতি পেলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাটগাতী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত মধ্যপাড়া গ্রামে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। গ্রামে কবরস্থান, মসজিদ, মাদ্রাসা ও গণশিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে।
পানি অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে
পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পানি নিষ্কাশনের নির্দেশ দিয়েছেন। দ্রুত পানি অপসারণের কাজ শুরু করা হবে।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিদারুল আলম বলেন, ‘টুঙ্গিপাড়া নিচু এলাকা হওয়ায় ভারী বৃষ্টি হলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি জানার পর জরুরি ভিত্তিতে পানি অপসারণের জন্য প্যানেল চেয়ারম্যান ও পৌরসভার প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাঁদের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি বন্ধে দ্রুত স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হোক।