১০:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কর্ণফুলী টানেলে যান চলাচল বাড়াতে টোল কমানোর চিন্তা করছে সরকার

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম:

কর্ণফুলী টানেলে যানবাহনের চলাচল বাড়াতে টোল হার পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে ভারী ও বাণিজ্যিক যানবাহনকে টানেল ব্যবহারে উৎসাহিত করতে টোল সহনীয় পর্যায়ে আনার বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সরকারের আশা, টোল যৌক্তিক করার পাশাপাশি আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান ইপিজেড, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নতুন সড়ক অবকাঠামো চালু হলে টানেলে যান চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব আব্দুর রউফ বলেন, টানেলের টোল হার সহনীয় করার চেষ্টা চলছে, যাতে ভারী যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। পাশাপাশি আনোয়ারা ও কোরিয়ান ইপিজেডের সঙ্গে সংযোগ সড়কের কাজও এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে টানেলের ট্রাফিক বহুগুণ বাড়বে।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পরও কর্ণফুলী টানেলে প্রত্যাশিত সংখ্যক যানবাহন চলাচল নিশ্চিত হয়নি। সেতু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে টোল আদায় হচ্ছে ১১ লাখ ২১ হাজার ৭৩০ টাকা। বিপরীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৬ টাকা।
উদ্বোধনের সময় দৈনিক প্রায় ১৮ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, তুলনামূলক বেশি টোলের কারণে অনেক ভারী যানবাহন এখনো শাহ আমানত সেতু ও কালুরঘাট সেতুর মতো বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, ভেন্টিলেশন, অগ্নিনিরাপত্তা, আলোকসজ্জা, সিসিটিভি ও আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় প্রতিদিন বড় অঙ্কের ব্যয় হচ্ছে।
সরকারের প্রত্যাশা, আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইজেড) চালু হলে টানেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) যৌথ উদ্যোগে ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠছে এ শিল্পাঞ্চল। এতে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ২৭ জুলাই প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম শিল্পকারখানায় উৎপাদন শুরু এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের বড় অংশ চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাক ও কনটেইনারবাহী যানবাহন কর্ণফুলী টানেল ব্যবহার করবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিন উদ্দীন বলেন, শিল্পাঞ্চল চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম একটি আধুনিক শিল্প উপশহরে পরিণত হবে। সে লক্ষ্যেই প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) খসড়া ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’-এ আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনায় মূল নগরের চাপ কমাতে নতুন স্যাটেলাইট টাউন ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবু ঈসা আনছারী বলেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে জলাবদ্ধতা, যানজট, খেলার মাঠ ও আধুনিক গণপরিবহনের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে বহুমুখী জেটি, আধুনিক সংযোগ সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এবং আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী, পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৯ জুন একনেক সভায় প্রায় ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে আনোয়ারা-দোহাজারী-কক্সবাজার বাইপাস এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া-চকোরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
সওজ চট্টগ্রাম দক্ষিণের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, প্রকল্পগুলোর জরিপ ও প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে যে শিল্প করিডর গড়ে উঠছে, তা চালু হলে টানেলে ভারী যানবাহনের চলাচল এবং রাজস্ব—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই অবকাঠামো আগে নির্মাণ করা হয়, পরে বিনিয়োগ আসে। তাই বর্তমান আয় দিয়ে টানেলের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। তবে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. সামশুল হক বলেন, শুধু টোল কমালেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ, কার্যকর বাইপাস সড়ক এবং লজিস্টিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে কর্ণফুলী টানেল তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

কর্ণফুলী টানেলে যান চলাচল বাড়াতে টোল কমানোর চিন্তা করছে সরকার

Update Time : ০৫:০৮:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম:

কর্ণফুলী টানেলে যানবাহনের চলাচল বাড়াতে টোল হার পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে ভারী ও বাণিজ্যিক যানবাহনকে টানেল ব্যবহারে উৎসাহিত করতে টোল সহনীয় পর্যায়ে আনার বিষয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সরকারের আশা, টোল যৌক্তিক করার পাশাপাশি আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান ইপিজেড, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নতুন সড়ক অবকাঠামো চালু হলে টানেলে যান চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব আব্দুর রউফ বলেন, টানেলের টোল হার সহনীয় করার চেষ্টা চলছে, যাতে ভারী যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। পাশাপাশি আনোয়ারা ও কোরিয়ান ইপিজেডের সঙ্গে সংযোগ সড়কের কাজও এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে টানেলের ট্রাফিক বহুগুণ বাড়বে।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পরও কর্ণফুলী টানেলে প্রত্যাশিত সংখ্যক যানবাহন চলাচল নিশ্চিত হয়নি। সেতু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে টোল আদায় হচ্ছে ১১ লাখ ২১ হাজার ৭৩০ টাকা। বিপরীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৬ টাকা।
উদ্বোধনের সময় দৈনিক প্রায় ১৮ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, তুলনামূলক বেশি টোলের কারণে অনেক ভারী যানবাহন এখনো শাহ আমানত সেতু ও কালুরঘাট সেতুর মতো বিকল্প পথ ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, ভেন্টিলেশন, অগ্নিনিরাপত্তা, আলোকসজ্জা, সিসিটিভি ও আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় প্রতিদিন বড় অঙ্কের ব্যয় হচ্ছে।
সরকারের প্রত্যাশা, আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইজেড) চালু হলে টানেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) যৌথ উদ্যোগে ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠছে এ শিল্পাঞ্চল। এতে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ২৭ জুলাই প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম শিল্পকারখানায় উৎপাদন শুরু এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের বড় অংশ চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, শিল্পাঞ্চলটি চালু হলে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ট্রাক ও কনটেইনারবাহী যানবাহন কর্ণফুলী টানেল ব্যবহার করবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিন উদ্দীন বলেন, শিল্পাঞ্চল চালু হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম একটি আধুনিক শিল্প উপশহরে পরিণত হবে। সে লক্ষ্যেই প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) খসড়া ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’-এ আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনায় মূল নগরের চাপ কমাতে নতুন স্যাটেলাইট টাউন ও পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবু ঈসা আনছারী বলেন, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে জলাবদ্ধতা, যানজট, খেলার মাঠ ও আধুনিক গণপরিবহনের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে বহুমুখী জেটি, আধুনিক সংযোগ সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এবং আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী, পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৯ জুন একনেক সভায় প্রায় ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে আনোয়ারা-দোহাজারী-কক্সবাজার বাইপাস এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া-চকোরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
সওজ চট্টগ্রাম দক্ষিণের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, প্রকল্পগুলোর জরিপ ও প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে যে শিল্প করিডর গড়ে উঠছে, তা চালু হলে টানেলে ভারী যানবাহনের চলাচল এবং রাজস্ব—দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আশিক ইমরান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই অবকাঠামো আগে নির্মাণ করা হয়, পরে বিনিয়োগ আসে। তাই বর্তমান আয় দিয়ে টানেলের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। তবে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. সামশুল হক বলেন, শুধু টোল কমালেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। শিল্পাঞ্চলগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ, কার্যকর বাইপাস সড়ক এবং লজিস্টিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারলে কর্ণফুলী টানেল তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।