
আশরাফুল আলম সরকার
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টোর
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দন্ডপাল ইউনিয়নের মৌমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এক শিশু শিক্ষার্থীর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী হাকিমপুর এলাকার মমিনুল ইসলামের ১০ বছর বয়সী মেয়ে মুক্তা এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী একই এলাকার ইদ্রিস আলীর ১১ বছর বয়সী ছেলে সিয়াম খেলাধুলা করতে গিয়ে বিদ্যালয়ের দেয়ালে ধাক্কা লেগে মাথায় আঘাতের পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
অসুস্থ শিশু শিক্ষার্থীকে দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগকারী অভিভাবকের দাবি, বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও অসুস্থ শিক্ষার্থী যথাযথ যত্ন ও সহযোগিতা পায়নি। এতে শিশুটি মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অভিভাবকরা অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক দেখভালের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
শিশু শিক্ষার্থী মুক্তার পিতা মমিনুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ে শিশু শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতেই পারে। তবে আমার অভিযোগ, এক শিক্ষার্থী আমার মেয়েকে ধাক্কা দিলে সে বিদ্যালয়ের দেয়ালে আঘাত পেয়ে মাথায় গুরুতর আহত হয়। এরপর বিদ্যালয়েই সে কয়েকবার বমি করে। অসুস্থ অবস্থায় বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমার মেয়ে রাস্তায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেন। খবর পেয়ে আমি তাকে প্রথমে দেবীগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরা তার অবস্থার অবনতি দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে রেফার করেন। বর্তমানে আমি আমার মেয়েকে নিয়ে রংপুরে চিকিৎসা করাচ্ছি। আমার অভিযোগ, ঘটনার পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার মেয়ের অসুস্থতার বিষয়ে আমাকে কোনো ধরনের তথ্য দেয়নি। আমি মনে করি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আমি এর বিচার দাবি করছি।
বিদ্যালয়ের পিয়ন রতন জানান, দুপুরে টিফিন বিতরণের সময় তিনি ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় শিক্ষার্থী মুক্তা অসুস্থ হয়ে পড়লেও বিষয়টি বিদ্যালয়ের ম্যাডামরা জানতেন, তবে তাকে কিছু জানানো হয়নি। অসুস্থ অবস্থায় মুক্তা বিদ্যালয়ে বমি করলে তার মাথায় পানি দেওয়া হয়। পরে কিছুটা সুস্থ বোধ করলে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
রতন জানান, তিনি গোলাপি ম্যাডাম ও নীলফা ম্যাডামের কাছে জানতে চান, শিক্ষার্থীর অভিভাবককে অসুস্থতার বিষয়টি জানানো হয়েছে কি না। জবাবে তারা বলেন, অভিভাবককে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। কিছুক্ষণ পর শিক্ষার্থী মুক্তার বাবা বিদ্যালয়ে এসে অসুস্থ মুক্তাকে নিয়ে দেবীগঞ্জ মেডিকেলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার আগে তিনি বিদ্যালয়ের ম্যাডামদের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জানান। পিয়ন রতনের মতে, শিক্ষার্থী অসুস্থর খবর দ্রুত তার অভিভাবককে জানানো উচিত ছিল।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা গোলাপি বলেন, টিফিনের সময় খেলাধুলার একপর্যায়ে শিক্ষার্থী মুক্তা অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে আমাদের জানায়নি যে তার শারীরিক অবস্থা এতটা খারাপ। পরে কিছুটা সুস্থ বোধ করলে বাড়ি যাওয়ার সময় তার ক্লাসের এক সহপাঠীর সঙ্গে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে জানায়, সে বাড়ি যেতে পারবে। বিষয়টি যে এত গুরুতর হয়ে উঠবে, তা আমরা কেউই ভাবিনি। বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা মনে করিনি যে সে এতটা অসুস্থ ছিল। সে স্বাভাবিকভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। তবে ক্লাসে দায়িত্বরত আমার এক সহকর্মী শিক্ষিকা আমাকে জানিয়েছেন, মুক্তা বমি করেছিল এবং তার মাথায় পানি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি আমি পরে জানতে পারি। বাড়ি যাওয়ার পথে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে-এ তথ্য আমি মুক্তার বাবার কাছ থেকে শুনেছি। বর্তমানে মুক্তা রংপুরে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আমরা তার বাবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আজমল হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার বিষয়টি আমাকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়নি। আপনাদের এক সহকর্মীর মাধ্যমে আমি ঘটনাটি জানতে পারি। পরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে কথা বলি। তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না, বেতন উত্তোলনের জন্য ব্যাংকে গিয়েছিলেন।
বর্তমানে শিক্ষার্থী অসুস্থ অবস্থায় রংপুরে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, সে যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। এরপর ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল অভিযোগটির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রতিনিধির নাম 



















