০৬:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিআরটিএ-তে পরিদর্শক বাবরের ইশারায় চলে দালাল রাজ

 

​মামুনুর রশিদ মামুন, ময়মনসিংহ:
ময়মনসিংহ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়টি এখন সাধারণ সেবা প্রার্থীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। আর এই কার্যালয়টিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবরের বিরুদ্ধে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে টাকার বিনিময়ে ফিটনেস সনদ দেওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকদের কৃত্রিম হয়রানি—সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তাঁর ইশারায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজস্ব ১০-১৫ সদস্যের একটি চিহ্নিত দালাল চক্রের মাধ্যমে তিনি এই ‘ঘুষের সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন, যা এখন বিআরটিএ কার্যালয়কে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ​সিন্ডিকেটের বাইরে সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই! সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো সাধারণ সেবা প্রার্থী বা যানবাহন মালিক সরাসরি নিয়ম মেনে আবেদন করলে শুরু হয় নানামুখী হয়রানি। যানবাহনের ছোটখাটো বা কাল্পনিক ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে আবেদনপত্র ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেই একই ব্যক্তি যখন জহির উদ্দিন বাবরের নিয়োজিত সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষের টাকা পৌঁছে দেন, তখন কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই দ্রুততম সময়ে কাজ হয়ে যায়। এই চক্রের বাইরে গিয়ে বিআরটিএ-তে কোনো ফাইল নড়ে না বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। ​সরকারি ফাইলে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ! অনুসন্ধানে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জহির উদ্দিন বাবরের কার্যালয়ের ভেতরে সরকারি নথিপত্র এবং সংবেদনশীল ফাইলপত্র ঘাটাঘাটি করছে বহিরাগত দালাল চক্রের সদস্যরা। সাধারণ মানুষের যেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত, সেখানে পরিদর্শকের টেবিল ও ড্রয়ার থেকে ফাইল বের করে যাচাই করছে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সরকারি দপ্তরের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ন্যূনতম বালাই এখানে নেই। এই কার্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ​আগের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় বেপরোয়া ভাব! স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, জহির উদ্দিন বাবরের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোনো প্রকার তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএ-র এক কর্মকর্তা জানান, “কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় অভিযুক্ত পরিদর্শক এবং তাঁর সিন্ডিকেট বাহিনী ধরে নিয়েছে যে প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও তাদের কিছুই যায় আসে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই তাঁদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।” ​অভিযুক্তের বক্তব্য: এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, “আমি নিয়ম মাফিক দায়িত্ব পালন করছি। দালাল চক্রের সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং সরকারি ফাইল বহিরাগতদের স্পর্শ করার সুযোগ নেই।”

​প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন: বিআরটিএ-র মতো একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য জিম্মিদশা দেশের সড়ক নিরাপত্তা এবং সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ ও পরিবহন মালিকদের দাবি, অতি দ্রুত এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও তাঁর দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

বিআরটিএ-তে পরিদর্শক বাবরের ইশারায় চলে দালাল রাজ

Update Time : ০৬:৩৬:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

 

​মামুনুর রশিদ মামুন, ময়মনসিংহ:
ময়মনসিংহ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়টি এখন সাধারণ সেবা প্রার্থীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। আর এই কার্যালয়টিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবরের বিরুদ্ধে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে টাকার বিনিময়ে ফিটনেস সনদ দেওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকদের কৃত্রিম হয়রানি—সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তাঁর ইশারায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজস্ব ১০-১৫ সদস্যের একটি চিহ্নিত দালাল চক্রের মাধ্যমে তিনি এই ‘ঘুষের সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন, যা এখন বিআরটিএ কার্যালয়কে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ​সিন্ডিকেটের বাইরে সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই! সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো সাধারণ সেবা প্রার্থী বা যানবাহন মালিক সরাসরি নিয়ম মেনে আবেদন করলে শুরু হয় নানামুখী হয়রানি। যানবাহনের ছোটখাটো বা কাল্পনিক ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে আবেদনপত্র ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সেই একই ব্যক্তি যখন জহির উদ্দিন বাবরের নিয়োজিত সিন্ডিকেট সদস্যদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষের টাকা পৌঁছে দেন, তখন কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই দ্রুততম সময়ে কাজ হয়ে যায়। এই চক্রের বাইরে গিয়ে বিআরটিএ-তে কোনো ফাইল নড়ে না বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। ​সরকারি ফাইলে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ! অনুসন্ধানে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জহির উদ্দিন বাবরের কার্যালয়ের ভেতরে সরকারি নথিপত্র এবং সংবেদনশীল ফাইলপত্র ঘাটাঘাটি করছে বহিরাগত দালাল চক্রের সদস্যরা। সাধারণ মানুষের যেখানে প্রবেশাধিকার সীমিত, সেখানে পরিদর্শকের টেবিল ও ড্রয়ার থেকে ফাইল বের করে যাচাই করছে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সরকারি দপ্তরের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ন্যূনতম বালাই এখানে নেই। এই কার্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ​আগের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় বেপরোয়া ভাব! স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, জহির উদ্দিন বাবরের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোনো প্রকার তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএ-র এক কর্মকর্তা জানান, “কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় অভিযুক্ত পরিদর্শক এবং তাঁর সিন্ডিকেট বাহিনী ধরে নিয়েছে যে প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও তাদের কিছুই যায় আসে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই তাঁদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।” ​অভিযুক্তের বক্তব্য: এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত মোটরযান পরিদর্শক জহির উদ্দিন বাবর তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, “আমি নিয়ম মাফিক দায়িত্ব পালন করছি। দালাল চক্রের সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং সরকারি ফাইল বহিরাগতদের স্পর্শ করার সুযোগ নেই।”

​প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন: বিআরটিএ-র মতো একটি স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য জিম্মিদশা দেশের সড়ক নিরাপত্তা এবং সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ ও পরিবহন মালিকদের দাবি, অতি দ্রুত এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও তাঁর দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।