০৭:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিথ্যার কোলাহল থামে, সত্যের আলো স্থায়ী হয়

 

মামুনুর রশীদ মামুন:
মানবসভ্যতার ইতিহাস বারবার একটি বাস্তব সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে—অসত্য কখনো স্থায়ী নয়। মিথ্যা, অপপ্রচার, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার দাপটে সত্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করা গেলেও, সময়ের নিরপেক্ষ আয়নায় একদিন সত্য ঠিকই স্বচ্ছ পানির মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কারণ সত্যের শক্তি কখনো শব্দের ওপর নির্ভর করে না; সত্য নিজের অস্তিত্বেই শক্তিশালী।
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে তথ্যের চেয়ে অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যুক্তির চেয়ে গুজব বেশি আলোচিত হয় এবং সত্যের চেয়ে সাজানো বক্তব্য অনেক সময় বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, রাজনৈতিক বিভাজন, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রভাবের প্রতিযোগিতায় সত্য আজ অনেক ক্ষেত্রেই চাপা পড়ে যাচ্ছে কৌশলী প্রচারণার ভিড়ে। কিন্তু ইতিহাস বলছে—যে সত্যকে মানুষ একসময় অবহেলা করেছে, সময়ই পরে সেই সত্যকে সবচেয়ে বড় বাস্তবতায় পরিণত করেছে।
সমাজে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সত্যকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। কখনো চরিত্রহনন, কখনো অপপ্রচার, কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার—বিভিন্ন উপায়ে সত্যকে আড়াল করার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা নিজস্ব গতিতেই প্রকাশিত হয়েছে। কারণ মিথ্যার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—তা টিকে থাকতে প্রতিনিয়ত নতুন মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। অন্যদিকে সত্যকে টিকে থাকার জন্য কোনো সাজসজ্জার প্রয়োজন হয় না।
আজকের সমাজে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে—মানুষ ধীরে ধীরে যাচাইয়ের চেয়ে আবেগে বেশি বিশ্বাসী হয়ে উঠছে। একটি গুজব, একটি কৃত্রিম ভিডিও কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা মুহূর্তেই মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করছে। ফলে সত্য জানার আগেই অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সামাজিক বিচারের শিকার হচ্ছে। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামাজিক ন্যায়বোধও।
সত্যকে চাপা দেওয়ার এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। কারণ যখন মানুষ সত্যের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও সামাজিক মূল্যবোধও দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা অবকাঠামোয় নয়; বরং সত্য বলার সাহস, ন্যায় প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং ভুলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সংস্কৃতির ওপরও নির্ভর করে।
এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়; বরং তথ্য যাচাই করে সত্যকে সামনে তুলে ধরা। কারণ সমাজে যখন বিভ্রান্তি বাড়ে, তখন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই মানুষের আস্থার শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে সচেতন নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে—কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার না করা, আবেগের চেয়ে বিবেককে গুরুত্ব দেওয়া এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
তবে সত্যের পথে চলা কখনো সহজ নয়। সত্য উচ্চারণ করতে গিয়ে অনেক মানুষকে সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত চাপের মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় সত্য বলার কারণে মানুষ একা হয়ে যায়, সমালোচিত হয়, এমনকি ষড়যন্ত্রেরও শিকার হয়। কিন্তু সময় প্রমাণ করে—যারা সত্যের পাশে ছিল, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলেছে।
এই কারণেই বলা হয়—
“অসত্য দিয়ে সত্যকে সাময়িকভাবে ঘোলা করা যায়, কিন্তু সময়ের আয়নায় সত্য একদিন স্বচ্ছ পানির মতোই পরিষ্কার হয়ে উঠবেই।”
কারণ সত্যকে থামানো যায় না; কেবল কিছু সময়ের জন্য বিলম্বিত করা যায়। সমাজে ন্যায়, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই সত্যের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনা জরুরি। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হলো সত্যকে ভয় না পাওয়া এবং অসত্যের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান নেওয়া। কারণ সময়ের কাছে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা নয়, প্রভাব নয়, কেবল সত্যই টিকে থাকে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

মিথ্যার কোলাহল থামে, সত্যের আলো স্থায়ী হয়

Update Time : ০৫:২৬:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

 

মামুনুর রশীদ মামুন:
মানবসভ্যতার ইতিহাস বারবার একটি বাস্তব সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে—অসত্য কখনো স্থায়ী নয়। মিথ্যা, অপপ্রচার, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার দাপটে সত্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করা গেলেও, সময়ের নিরপেক্ষ আয়নায় একদিন সত্য ঠিকই স্বচ্ছ পানির মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কারণ সত্যের শক্তি কখনো শব্দের ওপর নির্ভর করে না; সত্য নিজের অস্তিত্বেই শক্তিশালী।
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে তথ্যের চেয়ে অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যুক্তির চেয়ে গুজব বেশি আলোচিত হয় এবং সত্যের চেয়ে সাজানো বক্তব্য অনেক সময় বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, রাজনৈতিক বিভাজন, ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রভাবের প্রতিযোগিতায় সত্য আজ অনেক ক্ষেত্রেই চাপা পড়ে যাচ্ছে কৌশলী প্রচারণার ভিড়ে। কিন্তু ইতিহাস বলছে—যে সত্যকে মানুষ একসময় অবহেলা করেছে, সময়ই পরে সেই সত্যকে সবচেয়ে বড় বাস্তবতায় পরিণত করেছে।
সমাজে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যেখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সত্যকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। কখনো চরিত্রহনন, কখনো অপপ্রচার, কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার—বিভিন্ন উপায়ে সত্যকে আড়াল করার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা নিজস্ব গতিতেই প্রকাশিত হয়েছে। কারণ মিথ্যার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—তা টিকে থাকতে প্রতিনিয়ত নতুন মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। অন্যদিকে সত্যকে টিকে থাকার জন্য কোনো সাজসজ্জার প্রয়োজন হয় না।
আজকের সমাজে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে—মানুষ ধীরে ধীরে যাচাইয়ের চেয়ে আবেগে বেশি বিশ্বাসী হয়ে উঠছে। একটি গুজব, একটি কৃত্রিম ভিডিও কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা মুহূর্তেই মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করছে। ফলে সত্য জানার আগেই অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সামাজিক বিচারের শিকার হচ্ছে। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামাজিক ন্যায়বোধও।
সত্যকে চাপা দেওয়ার এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। কারণ যখন মানুষ সত্যের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও সামাজিক মূল্যবোধও দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি বা অবকাঠামোয় নয়; বরং সত্য বলার সাহস, ন্যায় প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং ভুলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সংস্কৃতির ওপরও নির্ভর করে।
এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়; বরং তথ্য যাচাই করে সত্যকে সামনে তুলে ধরা। কারণ সমাজে যখন বিভ্রান্তি বাড়ে, তখন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই মানুষের আস্থার শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে সচেতন নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে—কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া প্রচার না করা, আবেগের চেয়ে বিবেককে গুরুত্ব দেওয়া এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
তবে সত্যের পথে চলা কখনো সহজ নয়। সত্য উচ্চারণ করতে গিয়ে অনেক মানুষকে সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত চাপের মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় সত্য বলার কারণে মানুষ একা হয়ে যায়, সমালোচিত হয়, এমনকি ষড়যন্ত্রেরও শিকার হয়। কিন্তু সময় প্রমাণ করে—যারা সত্যের পাশে ছিল, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলেছে।
এই কারণেই বলা হয়—
“অসত্য দিয়ে সত্যকে সাময়িকভাবে ঘোলা করা যায়, কিন্তু সময়ের আয়নায় সত্য একদিন স্বচ্ছ পানির মতোই পরিষ্কার হয়ে উঠবেই।”
কারণ সত্যকে থামানো যায় না; কেবল কিছু সময়ের জন্য বিলম্বিত করা যায়। সমাজে ন্যায়, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই সত্যের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনা জরুরি। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হলো সত্যকে ভয় না পাওয়া এবং অসত্যের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান নেওয়া। কারণ সময়ের কাছে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা নয়, প্রভাব নয়, কেবল সত্যই টিকে থাকে।