০৮:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতা,সীমান্তে বাড়ছে মাদক প্রবাহ

 

মামুনুর রশীদ মামুন: ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তবর্তী কয়েকটি উপজেলা—হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নকলা,দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা—ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতের সীমান্তঘেঁষা এসব এলাকা ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে মাদক, চোরাচালান ও বিভিন্ন অবৈধ পণ্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্থানীয় প্রভাবশালী, দালাল ও অসাধু কিছু সদস্যকে “ম্যানেজ” করেই এই রুটগুলো সচল রেখেছে। পরে সেই মাদক ও চোরাই পণ্য পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।
সীমান্তঘেঁষা জনপদে সরেজমিন ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সচেতন মহলের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে ভয়ংকর এক বাস্তবতা। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাটকীয় অভিযান, ইয়াবা বা গাঁজার চালান জব্দ এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রচার করা হলেও মূল সিন্ডিকেট অনেকাংশেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সীমান্তপথে অবৈধ প্রবেশ ও মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। সীমান্তে বাড়ছে অস্বাভাবিক চলাচল
হালুয়াঘাট,ধোবাউড়া ও কলমাকান্দা এলাকার বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালানকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু সীমান্তপথে সন্দেহজনক লোকজনের চলাচল বাড়ছে। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় অনেক স্থানেই নজরদারি দুর্বল বলে দাবি তাদের। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সীমান্ত দিয়ে শুধু মাদক নয়, ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য, কসমেটিকস, নিষিদ্ধ ট্যাবলেট, এমনকি গবাদিপশু ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীও প্রবেশ করছে। তাদের দাবি, “ছোট বাহক” ধরা পড়লেও মূল নিয়ন্ত্রকরা অধিকাংশ সময়ই নিরাপদে থেকে যাচ্ছে।
“ম্যানেজ সংস্কৃতি” নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক এই অবৈধ বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু সদস্যকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা দিয়ে সীমান্তপথ সচল রাখা হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি “ম্যানেজ সংস্কৃতি” তৈরি হয়েছে। যার ফলে অভিযান হলেও তা অনেক সময় স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না। তাদের মতে, “মূল হোতাদের” বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
যুবসমাজে ভয়াবহ প্রভাব
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজকর্মীরা বলছেন, সীমান্তপথে সহজে মাদক প্রবেশ করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। স্কুল-কলেজপড়ুয়া অনেক কিশোর-কিশোরী নেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের। এতে সামাজিক অপরাধ, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। দুর্গাপুরের এক শিক্ষক বলেন,“গ্রামের অনেক পরিবার এখন আতঙ্কে থাকে। আগে যেখানে মাদক নিয়ে এত আলোচনা ছিল না, এখন প্রায় প্রতিটি এলাকায় কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।” অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন: সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন বাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মাদক জব্দ ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত অভিযানের পরও কীভাবে একই রুট ব্যবহার করে বারবার মাদক প্রবেশ করছে? তাদের দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়,সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ও আন্তঃসংস্থার সমন্বিত তৎপরতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে অভিযোগ রয়েছে,অনেক সময় বড় চালান আসার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, ফলে মূল কারবারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ! বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তপথে মাদক ও চোরাচালান কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি। কারণ মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে অস্ত্র, অর্থপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে,এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে কেন্দ্রীয়ভাবে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও মনিটরিং চালু করা প্রয়োজন।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চান স্থানীয়রা। স্থানীয়দের মতে,সীমান্তে টেকসই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা,দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও জরুরি।
তাদের আশঙ্কা,এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সীমান্তপথের এই অবৈধ নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হয়ে দেশের অভ্যন্তরে ভয়াবহ সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতা,সীমান্তে বাড়ছে মাদক প্রবাহ

Update Time : ০৪:৫৪:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

 

মামুনুর রশীদ মামুন: ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তবর্তী কয়েকটি উপজেলা—হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নকলা,দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা—ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতের সীমান্তঘেঁষা এসব এলাকা ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে মাদক, চোরাচালান ও বিভিন্ন অবৈধ পণ্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র স্থানীয় প্রভাবশালী, দালাল ও অসাধু কিছু সদস্যকে “ম্যানেজ” করেই এই রুটগুলো সচল রেখেছে। পরে সেই মাদক ও চোরাই পণ্য পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।
সীমান্তঘেঁষা জনপদে সরেজমিন ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সচেতন মহলের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে ভয়ংকর এক বাস্তবতা। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাটকীয় অভিযান, ইয়াবা বা গাঁজার চালান জব্দ এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রচার করা হলেও মূল সিন্ডিকেট অনেকাংশেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সীমান্তপথে অবৈধ প্রবেশ ও মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। সীমান্তে বাড়ছে অস্বাভাবিক চলাচল
হালুয়াঘাট,ধোবাউড়া ও কলমাকান্দা এলাকার বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালানকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু সীমান্তপথে সন্দেহজনক লোকজনের চলাচল বাড়ছে। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় অনেক স্থানেই নজরদারি দুর্বল বলে দাবি তাদের। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সীমান্ত দিয়ে শুধু মাদক নয়, ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য, কসমেটিকস, নিষিদ্ধ ট্যাবলেট, এমনকি গবাদিপশু ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীও প্রবেশ করছে। তাদের দাবি, “ছোট বাহক” ধরা পড়লেও মূল নিয়ন্ত্রকরা অধিকাংশ সময়ই নিরাপদে থেকে যাচ্ছে।
“ম্যানেজ সংস্কৃতি” নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক এই অবৈধ বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু সদস্যকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা দিয়ে সীমান্তপথ সচল রাখা হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি “ম্যানেজ সংস্কৃতি” তৈরি হয়েছে। যার ফলে অভিযান হলেও তা অনেক সময় স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারছে না। তাদের মতে, “মূল হোতাদের” বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
যুবসমাজে ভয়াবহ প্রভাব
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজকর্মীরা বলছেন, সীমান্তপথে সহজে মাদক প্রবেশ করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। স্কুল-কলেজপড়ুয়া অনেক কিশোর-কিশোরী নেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের। এতে সামাজিক অপরাধ, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। দুর্গাপুরের এক শিক্ষক বলেন,“গ্রামের অনেক পরিবার এখন আতঙ্কে থাকে। আগে যেখানে মাদক নিয়ে এত আলোচনা ছিল না, এখন প্রায় প্রতিটি এলাকায় কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।” অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন: সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন বাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মাদক জব্দ ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত অভিযানের পরও কীভাবে একই রুট ব্যবহার করে বারবার মাদক প্রবেশ করছে? তাদের দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়,সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ও আন্তঃসংস্থার সমন্বিত তৎপরতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে অভিযোগ রয়েছে,অনেক সময় বড় চালান আসার আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, ফলে মূল কারবারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ! বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তপথে মাদক ও চোরাচালান কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি। কারণ মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে অস্ত্র, অর্থপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে,এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে কেন্দ্রীয়ভাবে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও মনিটরিং চালু করা প্রয়োজন।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ চান স্থানীয়রা। স্থানীয়দের মতে,সীমান্তে টেকসই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা,দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তবাসীর বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও জরুরি।
তাদের আশঙ্কা,এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সীমান্তপথের এই অবৈধ নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হয়ে দেশের অভ্যন্তরে ভয়াবহ সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।