০৯:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডুমুরিয়ার বিল ডাকাতিয়া: ফসলের নিচের পানি যেন কৃষকের বুক ফাটা আর্তনাদ

শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া খুলনা।
শনিবার ২ মে ডুমুরিয়া খুলনা।
খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত বিল ডাকাতিয়া এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ভারী বর্ষণ ও সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে বিলের হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন পানির রাজ্যে তলিয়ে গেছে।
স্থায়ী জলাবদ্ধতা: নদী-খাল ভরাট এবং অকেজো স্লুইসগেটের কারণে বিলের পানি নামতে পারছে না, ফলে বছরের বড় একটা সময় বিলের জমি পানির নিচে থাকে।
ফসলের ব্যাপক ক্ষতি: কাটার উপযোগী বোরো ধানসহ হাজার হাজার একর জমির ফসল পানির নিচে ডুবে নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে কৃষকরা চরম অর্থ সংকটে পড়েছেন।
কৃষক থেকে মৎস্যজীবী: কৃষি জমিতে ফসল ফালাতে না পেরে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করে মৎস্য চাষে বা মাছ ধরায় নিয়োজিত হয়েছেন, অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: বিলের ভেতরের রাস্তাঘাট এবং বসতবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। চলাচল করতে হচ্ছে ডোঙায় (ছোট নৌকা)।কৃষকদের আর্তনাদ:
কোমরাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক জানান, তার জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, পানি না কমলে সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া শ্রমিক সংকটের কারণে পানির মধ্যে কাজ করতে না চাওয়ায় অনেক জমির ধান মাঠেই নষ্ট হচ্ছে।
সমাধানের দাবি স্থানীয়রা শোলমারী নদী ও অন্যান্য খালগুলো পুনঃখনন এবং অবরুদ্ধ পানি নিষ্কাশনের জন্য জোয়ার-ভাটা আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করার দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী সমাধানের আকুল আবেদন জানিয়েছেন, যাতে আবার বিল ডাকাতিয়া সোনালি ধানের ফসলে ভরে ওঠে।
বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা এবং কৃষকদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সত্যিই একটি হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। যে পানি ফসলের আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল, অপরিকল্পিত পোল্ডার ব্যবস্থা এবং পলি জমে নদী ভরাট হওয়ার কারণে সেই পানিই এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিল ডাকাতিয়া ও বিল শিংগা ফসলের নিচের পানি যেন কৃষকের বুক ফাটা আর্তনাদ, এক সময়ের প্রমত্তা বিল ডাকাতিয়া এখন যেন কৃষকের কান্নার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠের পরিবর্তে এখন সেখানে কেবলই থৈ থৈ পানি। তবে এই পানি প্রাণের সঞ্চার নয়, বরং কেড়ে নিচ্ছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে যেখানে সোনালী ধানের হাসি থাকার কথা, সেখানে এখন নোনা জলের দীর্ঘশ্বাস।
খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতলা এবং যশোরের অভয়নগর ও মণিরামপুর উপজেলার বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত এই বিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিলের পানি সরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় ফসলি জমি। কৃষকরা বুক ফাটানো আর্তনাদ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন তাদের ডুবন্ত ফসলের দিকে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, শত চেষ্টা করেও তারা বিলে আমন বা বোরো কোনো আবাদই ঠিকমতো করতে পারছেন না। অনেক কৃষক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চড়া সুদে টাকা ধার করে চাষাবাদ করেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ফসলের নিচের এই জমে থাকা পানি কেবল ধান নষ্ট করছে না, বরং হাজারো পরিবারের জীবনযাত্রাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিলে পানি নিষ্কাশনের জন্য টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বা জোয়ারাধার পদ্ধতির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নদী খননের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে বিল ডাকাতিয়ার এই কান্না থামছে না।
কৃষকদের দাবি, সরকার যদি দ্রুত স্লুইস গেট সংস্কার এবং নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ না নেয়, তবে বিল ডাকাতিয়া কেবল মানচিত্রেরই অংশ হয়ে থাকবে, যেখানে কৃষকের শ্রমের কোনো মূল্য থাকবে না।
ডুমুরিয়া উপজেলার ২নং রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদর চেয়ারম্যান মনোজিৎ বালা বলেন; দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি।
বিল ডাকাতিয়া, ওবিল‌ শিংগার বিলের ধান কেটে রাখা অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে ধান তলিয়ে গেছেও খালের পানি সরবরাহের জন্য কোন ব্যবস্থা করছেন কিনা সে ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সবিতা সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান বিলের পানি সরানোর জন্য আমাকে কেউ বলেননি, এটা আমি জানিনা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

ডুমুরিয়ার বিল ডাকাতিয়া: ফসলের নিচের পানি যেন কৃষকের বুক ফাটা আর্তনাদ

Update Time : ০৫:২৪:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬

শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া খুলনা।
শনিবার ২ মে ডুমুরিয়া খুলনা।
খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত বিল ডাকাতিয়া এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর ভারী বর্ষণ ও সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে বিলের হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের সোনালি স্বপ্ন এখন পানির রাজ্যে তলিয়ে গেছে।
স্থায়ী জলাবদ্ধতা: নদী-খাল ভরাট এবং অকেজো স্লুইসগেটের কারণে বিলের পানি নামতে পারছে না, ফলে বছরের বড় একটা সময় বিলের জমি পানির নিচে থাকে।
ফসলের ব্যাপক ক্ষতি: কাটার উপযোগী বোরো ধানসহ হাজার হাজার একর জমির ফসল পানির নিচে ডুবে নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে কৃষকরা চরম অর্থ সংকটে পড়েছেন।
কৃষক থেকে মৎস্যজীবী: কৃষি জমিতে ফসল ফালাতে না পেরে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করে মৎস্য চাষে বা মাছ ধরায় নিয়োজিত হয়েছেন, অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: বিলের ভেতরের রাস্তাঘাট এবং বসতবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। চলাচল করতে হচ্ছে ডোঙায় (ছোট নৌকা)।কৃষকদের আর্তনাদ:
কোমরাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক জানান, তার জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, পানি না কমলে সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া শ্রমিক সংকটের কারণে পানির মধ্যে কাজ করতে না চাওয়ায় অনেক জমির ধান মাঠেই নষ্ট হচ্ছে।
সমাধানের দাবি স্থানীয়রা শোলমারী নদী ও অন্যান্য খালগুলো পুনঃখনন এবং অবরুদ্ধ পানি নিষ্কাশনের জন্য জোয়ার-ভাটা আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করার দাবি জানিয়েছেন। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী সমাধানের আকুল আবেদন জানিয়েছেন, যাতে আবার বিল ডাকাতিয়া সোনালি ধানের ফসলে ভরে ওঠে।
বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা এবং কৃষকদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সত্যিই একটি হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। যে পানি ফসলের আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল, অপরিকল্পিত পোল্ডার ব্যবস্থা এবং পলি জমে নদী ভরাট হওয়ার কারণে সেই পানিই এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিল ডাকাতিয়া ও বিল শিংগা ফসলের নিচের পানি যেন কৃষকের বুক ফাটা আর্তনাদ, এক সময়ের প্রমত্তা বিল ডাকাতিয়া এখন যেন কৃষকের কান্নার সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠের পরিবর্তে এখন সেখানে কেবলই থৈ থৈ পানি। তবে এই পানি প্রাণের সঞ্চার নয়, বরং কেড়ে নিচ্ছে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে যেখানে সোনালী ধানের হাসি থাকার কথা, সেখানে এখন নোনা জলের দীর্ঘশ্বাস।
খুলনার ডুমুরিয়া, ফুলতলা এবং যশোরের অভয়নগর ও মণিরামপুর উপজেলার বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত এই বিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিলের পানি সরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় ফসলি জমি। কৃষকরা বুক ফাটানো আর্তনাদ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন তাদের ডুবন্ত ফসলের দিকে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, শত চেষ্টা করেও তারা বিলে আমন বা বোরো কোনো আবাদই ঠিকমতো করতে পারছেন না। অনেক কৃষক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চড়া সুদে টাকা ধার করে চাষাবাদ করেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ফসলের নিচের এই জমে থাকা পানি কেবল ধান নষ্ট করছে না, বরং হাজারো পরিবারের জীবনযাত্রাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিলে পানি নিষ্কাশনের জন্য টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বা জোয়ারাধার পদ্ধতির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নদী খননের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে বিল ডাকাতিয়ার এই কান্না থামছে না।
কৃষকদের দাবি, সরকার যদি দ্রুত স্লুইস গেট সংস্কার এবং নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ না নেয়, তবে বিল ডাকাতিয়া কেবল মানচিত্রেরই অংশ হয়ে থাকবে, যেখানে কৃষকের শ্রমের কোনো মূল্য থাকবে না।
ডুমুরিয়া উপজেলার ২নং রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদর চেয়ারম্যান মনোজিৎ বালা বলেন; দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছি।
বিল ডাকাতিয়া, ওবিল‌ শিংগার বিলের ধান কেটে রাখা অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে ধান তলিয়ে গেছেও খালের পানি সরবরাহের জন্য কোন ব্যবস্থা করছেন কিনা সে ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সবিতা সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান বিলের পানি সরানোর জন্য আমাকে কেউ বলেননি, এটা আমি জানিনা।