১১:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানতা সম্প্রদায়ের উন্নয়নে বরিশালে নতুন উদ্যোগ ‘মানতা কানেক্ট’ মানতাদের মূলধারায় আনতে হবেঃ বিসিসি প্রশাসক শিরিন

 

বরিশালের প্রান্তিক মানতা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মানুষকে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে নতুন একটি প্রকল্প শুরু হয়েছে। ‘মানতা কানেক্ট’ নামে এ উদ্যোগের উদ্বোধনী সভা মঙ্গলবার নগরের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে যুব নেতৃত্বের সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তিনি বলেন, “উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষও তার সুফল পায়। কাউকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে প্রত্যেক মানুষের অবদান দরকার। মানতা সম্প্রদায়ের জন্য এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় সরকার, প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠন একসঙ্গে কাজ করলে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনমান পরিবর্তন সম্ভব।”

মানতা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় নদীগুলোতে নৌকায় বসবাসকারী একটি ভাসমান যাযাবর জেলে সম্প্রদায়। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের অনেকেরই নেই স্থায়ী ঠিকানা, জমি বা আইনি পরিচয়। চরম দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবের মধ্যে তারা নদীর বুকে সংগ্রামী জীবনযাপন করেন।

বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের মানতা জেলে সম্প্রদায় দেশের অন্যতম প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ভাসমান জীবনযাপনের কারণে তারা স্থায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেকের জন্মনিবন্ধন নেই, অনেক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে বিলম্ব হয়। অধিকাংশ পরিবারই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতার বাইরে। ভূমিহীনতা, নীতিগত স্বীকৃতির অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই সংকটকে আরও তীব্র করছে।

আয়োজকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যাংকিং সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার সীমিত। নতুন এ প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মৌলিক সেবার সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘মানতা কানেক্ট’ প্রকল্পটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এর মাধ্যমে জলেভাসা মানতা সম্প্রদায়ের জন্য ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষা সহায়তা এবং সহজলভ্য কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ফান্ডের অর্থায়নে ইয়ুথনেট গ্লোবাল, জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট ও ডকটাইম যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। আয়োজকেরা জানান, এ কর্মশালার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীজন ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় ও যৌথ অঙ্গীকার গড়ে তোলা হবে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের ভিত্তি তৈরি করবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিভিল সার্জন ডাঃ এস.এম. মনজুর-এ-এলাহী, বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা: ফরিদা সুলতানা, মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোঃ আনিসুজ্জামান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: শাহাবুদ্দিন সরদার, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ.কে.এম আখতারুজ্জামান তালুকদার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: মোস্তফা কামাল এবং দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার এ এম সাজ্জাদ খান।

স্বাগত বক্তব্য দেন ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান (শুভ) ও মানতা উন্নয়ন কমিটির সভাপতি জসিম সর্দার।

এ ছাড়া ‘মানতা জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু চ্যালেঞ্জ ও সমাধান’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ, টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাদিরা জাহান, চরবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ আলম, মানতা নারী নেত্রী রাবেয়া বেগম প্রমুখ।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মানতা সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষায় যুক্ত করা, নারীদের আয়বর্ধক কাজে সম্পৃক্ত করা এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে।

সোহানুর রহমান বলেন, মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা পৌঁছে দিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তাঁদের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমও থাকবে।

আয়োজকেরা জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

মানতা সম্প্রদায়ের উন্নয়নে বরিশালে নতুন উদ্যোগ ‘মানতা কানেক্ট’ মানতাদের মূলধারায় আনতে হবেঃ বিসিসি প্রশাসক শিরিন

Update Time : ০৬:৩০:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

 

বরিশালের প্রান্তিক মানতা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মানুষকে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে নতুন একটি প্রকল্প শুরু হয়েছে। ‘মানতা কানেক্ট’ নামে এ উদ্যোগের উদ্বোধনী সভা মঙ্গলবার নগরের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে যুব নেতৃত্বের সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। তিনি বলেন, “উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষও তার সুফল পায়। কাউকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে প্রত্যেক মানুষের অবদান দরকার। মানতা সম্প্রদায়ের জন্য এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “স্থানীয় সরকার, প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠন একসঙ্গে কাজ করলে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনমান পরিবর্তন সম্ভব।”

মানতা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় নদীগুলোতে নৌকায় বসবাসকারী একটি ভাসমান যাযাবর জেলে সম্প্রদায়। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের অনেকেরই নেই স্থায়ী ঠিকানা, জমি বা আইনি পরিচয়। চরম দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবের মধ্যে তারা নদীর বুকে সংগ্রামী জীবনযাপন করেন।

বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের মানতা জেলে সম্প্রদায় দেশের অন্যতম প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ভাসমান জীবনযাপনের কারণে তারা স্থায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেকের জন্মনিবন্ধন নেই, অনেক শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না, জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে বিলম্ব হয়। অধিকাংশ পরিবারই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতার বাইরে। ভূমিহীনতা, নীতিগত স্বীকৃতির অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই সংকটকে আরও তীব্র করছে।

আয়োজকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের ব্যাংকিং সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার সীমিত। নতুন এ প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মৌলিক সেবার সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘মানতা কানেক্ট’ প্রকল্পটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এর মাধ্যমে জলেভাসা মানতা সম্প্রদায়ের জন্য ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষা সহায়তা এবং সহজলভ্য কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ফান্ডের অর্থায়নে ইয়ুথনেট গ্লোবাল, জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট ও ডকটাইম যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। আয়োজকেরা জানান, এ কর্মশালার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অংশীজন ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় ও যৌথ অঙ্গীকার গড়ে তোলা হবে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের ভিত্তি তৈরি করবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সিভিল সার্জন ডাঃ এস.এম. মনজুর-এ-এলাহী, বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা: ফরিদা সুলতানা, মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোঃ আনিসুজ্জামান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো: শাহাবুদ্দিন সরদার, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ.কে.এম আখতারুজ্জামান তালুকদার, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: মোস্তফা কামাল এবং দি এশিয়া ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার এ এম সাজ্জাদ খান।

স্বাগত বক্তব্য দেন ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান (শুভ) ও মানতা উন্নয়ন কমিটির সভাপতি জসিম সর্দার।

এ ছাড়া ‘মানতা জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু চ্যালেঞ্জ ও সমাধান’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ, টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাদিরা জাহান, চরবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ আলম, মানতা নারী নেত্রী রাবেয়া বেগম প্রমুখ।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মানতা সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষায় যুক্ত করা, নারীদের আয়বর্ধক কাজে সম্পৃক্ত করা এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে।

সোহানুর রহমান বলেন, মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা পৌঁছে দিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তাঁদের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমও থাকবে।

আয়োজকেরা জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে ধাপে ধাপে মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।