
মেহেরুল ইসলাম মোহন স্টাফ রিপোর্টার
নাটোরের লালপুর উপজেলা জুড়ে ঘন্টায় ঘন্টায় বিদ্যুৎ এর ভেলকি বাজিতে অতিষ্ঠ জন জীবনে আবারও ফিরে এসেছে সেই পুরোনো দিনের নির্ভরতা হাতপাখা। দেশের সব চেয়ে উষ্ণতম অঞ্চল ও সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাতের এলাকা খ্যাত নাটোরে লালপুর।শত ভাগ বিদ্যুতায়ীত এই উপজেলায় আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই হাতপাখা নামক উপকরণ এখন গরম থেকে বাঁচার প্রধান ভরসা। উপজেলার লালপুর, গোপালপুর, মোমিনপু,বিলমাড়িয়া, দুড়দুড়িয়া ও ভেল্লাবাড়িয়া এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখা যায়,তালপাতা, বাঁশ ও রঙিন কাপড়ের তৈরি নানা রকমের ও ধরনের হাতপাখা সাজিয়ে ফেরি করে পাড়ায়, মহল্লায় ও বাজারে বিক্রি করছে পাখা বিক্রেতারা।বিদ্যুতের অনিশ্চয়তায় এসব পাখার চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ ও গ্রামীণ পরিবারের সদস্যদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে সহজলভ্য স্বস্তির উপায়।ভেল্লাবাড়িয়া বাজার ও মাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ এক পাখা বিক্রেতার সাথে কথা হলে তিনি বলেন,আগে গরমের সময় কিছু বিক্রি হতো। কিন্তু এবার বিদ্যুতের ঘন্টায় ঘন্টায় ভেলকি বাজির সমস্যার কারণে পাখার চাহিদা অনেক বেড়েছে।প্রতিদিনই ব্যাপকহারে বিক্রি হচ্ছে এবং নতুন করে আবার পাখা আনতে হচ্ছে।ঐ এলাকার এক গৃহিণী বলেন“দিনে কোনোভাবে সময় কাটে,কিন্তু রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্ট হয়। তাই কয়েকটা হাতপাখা কিনেছি,অন্তত একটু স্বস্তি পাওয়া যায়।এক দিনমজুর বলেন,বিদ্যুৎ থাকে না, ফ্যান কিনেও লাভ নেই। তাই কম দামের হাতপাখাই এখন ভরসা।
এস এস সি এক পরীক্ষার্থী বলেন,রাতে পড়তে বসলে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন হাতপাখা ছাড়া উপায় থাকে না,গরমে পড়াশোনাও কঠিন হয়ে যায়।অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রশিদ মাষ্টার অতীতের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমাদের সময় তো হাতপাখাই ছিল সব। এখন আবার সেই দিন ফিরে আসছে। তবে এখন গরমের তীব্রতা বেশি, কষ্টও বেশি।” এই হাতপাখা কেবল একটি ব্যবহারিক উপকরণ নয়, বরং বাঙালির দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ। ইতিহাস বলে গ্রিক ও রোমান সভ্যতার সময় থেকেই হাতপাখার ব্যবহার ছিল। প্রথম দিকে পাখার নকশা ছিল সরল ও ভাঁজহীন। পরে চীন ও জাপানের প্রভাবে ইউরোপে ভাঁজ করা পাখার প্রচলন শুরু হয়। আঠারো শতকে ইউরোপে পাখা তৈরির শিল্প গড়ে উঠলেও তা ছিল অভিজাতদের বিলাসপণ্য। পাখার গায়ে কারুকার্য, অলংকার ও সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হতো। আজও এসব পাখার নিদর্শন বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলার প্রেক্ষাপটে তালপাখা এক অনন্য আবেগের নাম। লোকগাঁথায় শোনা যায়-“আমার নাম তালের পাখা, শীতকালে দেই না দেখা, গ্রীষ্মকালে প্রাণের সখা। তালপাখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিবেশবান্ধবতা। তালগাছ মাটির ক্ষয় রোধ, পানি ধারণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তালপাখার ব্যবহার একদিকে যেমন ঐতিহ্যকে ধরে রাখে, অন্যদিকে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করে। সব মিলিয়ে লালপুর উপজেলা জুড়ে ঘন্টায় ঘন্টায় বিদ্যুৎ এর ভেলকি বাজির কারনে হাতপাখাকে আবারও জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। মানুষের অভিজ্ঞতা, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এবং পরিবেশবান্ধবতার মেলবন্ধনে হাতপাখা হয়ে উঠেছে সময়ের বাস্তবতায় এক অনিবার্য সঙ্গী।
প্রতিনিধির নাম 



















