০৮:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগুনের গোল্লা চুয়াডাঙ্গা: গলছে রাস্তার পিচ, জনজীবনে ত্রাহি ত্রাহি দশা

মোঃ নাঈম উদ্দীন
বিশেষ প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা।
শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ইং

উত্তপ্ত কড়াইয়ের মতো তপ্ত চুয়াডাঙ্গা। মাথার ওপর আগুনের পিণ্ড হয়ে আসা সূর্যের প্রখরতা আর নিচ থেকে পিচঢালা রাস্তার তপ্ত ভাপ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সীমান্তঘেঁষা এই জেলার সাধারণ মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রার পারদ যে হারে চড়ছে, তাতে জনজীবন কেবল বিপর্যস্তই নয়, রীতিমতো স্থবির হয়ে পড়েছে।

আজ শুক্রবার দুপুর ৩টায় জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৪৯ শতাংশ।

তীব্র দাবদাহে চুয়াডাঙ্গা শহরে দেখা দিয়েছে এক বিরল ও ভয়াবহ দৃশ্য। দুপুরের তপ্ত রোদে শহরের প্রধান সড়কগুলোর পিচ গলে আলকাতরার মতো নরম হয়ে গেছে। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা সংলগ্ন এলাকা এবং বাণিজ্যিক মোড়গুলোতে রাস্তার উপরিভাগ তরল হয়ে চাকার সাথে লেপ্টে যাচ্ছে।

এতে করে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের মতো ছোট যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিছলে যাচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। পথচারীরা জানিয়েছেন, রাস্তা থেকে উঠে আসা গরম ভাপে চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া করছে, যা জনচলাচলকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।

একদিকে কাঠফাটা রোদ, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকট—এই দুইয়ে মিলে মোটরসাইকেল চালকদের নাভিশ্বাস উঠেছে। শহরের তেলের পাম্পগুলোতে দেখা গেছে দীর্ঘ সারি। রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অনেককে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা গেছে।

লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিপন হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন,
“মাথার ওপর সূর্য আর নিচে গলন্ত পিচের তাপ। এই নরক যন্ত্রণার মধ্যে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। শরীর আর চলছে না ভাই।”

সবচেয়ে কষ্টে আছেন দিনমজুর, রিকশাচালক এবং কৃষিশ্রমিকরা। পেটের তাগিদে রোদে বের হলেও কিছুক্ষণ পরই ছায়ার খোঁজে ছুটতে হচ্ছে তাদের। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় শরীর থেকে দ্রুত পানি বেরিয়ে যাচ্ছে, ফলে ক্লান্তি ও জ্বালাপোড়া বেশি অনুভূত হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই গরমে হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া ও তীব্র পানিশূন্যতার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ জামিনুর রহমান জানান, জেলার ওপর দিয়ে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন,
“আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রা কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং এটি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।”

পরিবেশবাদীরা এই পরিস্থিতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ওবায়দুর রহমানের কথায় ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক—
“এপ্রিলেই যদি পিচ গলে যায়, তবে মে-জুন মাসে আমাদের কপালে কী আছে তা ভেবেই বুক কাঁপছে।”

তীব্র এই খরায় জেলার প্রধান কৃষি খাতে সেচ সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় সেচ পাম্প কাজ করছে না।

একই সাথে তীব্র তাপে পশুপাখি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত বনায়ন এবং জলাশয় রক্ষা না করলে চুয়াডাঙ্গা অদূর ভবিষ্যতে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মেঘহীন আকাশে এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে চুয়াডাঙ্গার তৃষ্ণার্থ মানুষ ও প্রকৃতি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

আগুনের গোল্লা চুয়াডাঙ্গা: গলছে রাস্তার পিচ, জনজীবনে ত্রাহি ত্রাহি দশা

Update Time : ০৪:৪১:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

মোঃ নাঈম উদ্দীন
বিশেষ প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা।
শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ইং

উত্তপ্ত কড়াইয়ের মতো তপ্ত চুয়াডাঙ্গা। মাথার ওপর আগুনের পিণ্ড হয়ে আসা সূর্যের প্রখরতা আর নিচ থেকে পিচঢালা রাস্তার তপ্ত ভাপ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সীমান্তঘেঁষা এই জেলার সাধারণ মানুষ। গত কয়েকদিন ধরে চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রার পারদ যে হারে চড়ছে, তাতে জনজীবন কেবল বিপর্যস্তই নয়, রীতিমতো স্থবির হয়ে পড়েছে।

আজ শুক্রবার দুপুর ৩টায় জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৪৯ শতাংশ।

তীব্র দাবদাহে চুয়াডাঙ্গা শহরে দেখা দিয়েছে এক বিরল ও ভয়াবহ দৃশ্য। দুপুরের তপ্ত রোদে শহরের প্রধান সড়কগুলোর পিচ গলে আলকাতরার মতো নরম হয়ে গেছে। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা সংলগ্ন এলাকা এবং বাণিজ্যিক মোড়গুলোতে রাস্তার উপরিভাগ তরল হয়ে চাকার সাথে লেপ্টে যাচ্ছে।

এতে করে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের মতো ছোট যানবাহনগুলো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিছলে যাচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। পথচারীরা জানিয়েছেন, রাস্তা থেকে উঠে আসা গরম ভাপে চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া করছে, যা জনচলাচলকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।

একদিকে কাঠফাটা রোদ, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের সংকট—এই দুইয়ে মিলে মোটরসাইকেল চালকদের নাভিশ্বাস উঠেছে। শহরের তেলের পাম্পগুলোতে দেখা গেছে দীর্ঘ সারি। রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অনেককে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা গেছে।

লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিপন হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন,
“মাথার ওপর সূর্য আর নিচে গলন্ত পিচের তাপ। এই নরক যন্ত্রণার মধ্যে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। শরীর আর চলছে না ভাই।”

সবচেয়ে কষ্টে আছেন দিনমজুর, রিকশাচালক এবং কৃষিশ্রমিকরা। পেটের তাগিদে রোদে বের হলেও কিছুক্ষণ পরই ছায়ার খোঁজে ছুটতে হচ্ছে তাদের। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় শরীর থেকে দ্রুত পানি বেরিয়ে যাচ্ছে, ফলে ক্লান্তি ও জ্বালাপোড়া বেশি অনুভূত হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই গরমে হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া ও তীব্র পানিশূন্যতার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ জামিনুর রহমান জানান, জেলার ওপর দিয়ে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন,
“আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রা কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং এটি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।”

পরিবেশবাদীরা এই পরিস্থিতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ওবায়দুর রহমানের কথায় ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক—
“এপ্রিলেই যদি পিচ গলে যায়, তবে মে-জুন মাসে আমাদের কপালে কী আছে তা ভেবেই বুক কাঁপছে।”

তীব্র এই খরায় জেলার প্রধান কৃষি খাতে সেচ সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক জায়গায় সেচ পাম্প কাজ করছে না।

একই সাথে তীব্র তাপে পশুপাখি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত বনায়ন এবং জলাশয় রক্ষা না করলে চুয়াডাঙ্গা অদূর ভবিষ্যতে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মেঘহীন আকাশে এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে চুয়াডাঙ্গার তৃষ্ণার্থ মানুষ ও প্রকৃতি।