০৭:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্কুলছাত্রী ধর্ষণ মামলা: চুয়াডাঙ্গায় কার্পাসডাঙ্গার সালামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

মোঃ নাঈম উদ্দীন
বিশেষ প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা।
২০ এপ্রিল, ২০২৬ ইং

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় দশম শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের দায়ে মো. সালাম (২৫) নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে চুয়াডাঙ্গা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মোক্তাগীর আলম জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত সালাম দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের বজলুর রশিদ মজুর ছেলে।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ সকালে ওই স্কুলছাত্রী বাড়ি থেকে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়। পথিমধ্যে কার্পাসডাঙ্গা এলাকায় পৌঁছালে ওত পেতে থাকা সালাম ও তার সহযোগীরা তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে ভিকটিমকে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে বিয়ের প্রলোভন দেখানো হয়। এক পর্যায়ে আসামি সালাম একটি “কাল্পনিক কাবিননামা” বা ভুয়া বিয়ের কাগজপত্র তৈরি করে ভুক্তভোগী কিশোরীকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে যে তারা বিবাহিত। এই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ভিকটিমের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।

ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার দামুড়হুদা থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ ভিকটিমকে উদ্ধার এবং আসামিকে গ্রেপ্তার করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হারুন অর রশীদ দীর্ঘ তদন্ত শেষে সালামের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরা শেষে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।

বিচারক তার রায়ে দুটি পৃথক ধারায় সাজা প্রদান করেন:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারা (ধর্ষণ): এই ধারায় আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আইনের ৭ ধারা (অপহরণ): অপহরণের দায়ে তাকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, উভয় সাজা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে। রায় ঘোষণার পরপরই কঠোর পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত সালামকে চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এম এম শাহজাহান মুকুল বলেন:
“বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের যে ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এই কঠোর রায় তা রোধে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। ভুয়া কাবিননামা বানিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে যে জঘন্য অপরাধ আসামি করেছে, তার যোগ্য শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। আমরা এই রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”
এদিকে রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবার আদালতের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ায় বিচারকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, এই রায় দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ নির্মূল হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

স্কুলছাত্রী ধর্ষণ মামলা: চুয়াডাঙ্গায় কার্পাসডাঙ্গার সালামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

Update Time : ০৪:৫৭:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

মোঃ নাঈম উদ্দীন
বিশেষ প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা।
২০ এপ্রিল, ২০২৬ ইং

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় দশম শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের দায়ে মো. সালাম (২৫) নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে চুয়াডাঙ্গা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মোক্তাগীর আলম জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত সালাম দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের বজলুর রশিদ মজুর ছেলে।

মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ সকালে ওই স্কুলছাত্রী বাড়ি থেকে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়। পথিমধ্যে কার্পাসডাঙ্গা এলাকায় পৌঁছালে ওত পেতে থাকা সালাম ও তার সহযোগীরা তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে ভিকটিমকে বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে বিয়ের প্রলোভন দেখানো হয়। এক পর্যায়ে আসামি সালাম একটি “কাল্পনিক কাবিননামা” বা ভুয়া বিয়ের কাগজপত্র তৈরি করে ভুক্তভোগী কিশোরীকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে যে তারা বিবাহিত। এই প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ভিকটিমের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।

ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার দামুড়হুদা থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ ভিকটিমকে উদ্ধার এবং আসামিকে গ্রেপ্তার করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হারুন অর রশীদ দীর্ঘ তদন্ত শেষে সালামের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরা শেষে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।

বিচারক তার রায়ে দুটি পৃথক ধারায় সাজা প্রদান করেন:
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারা (ধর্ষণ): এই ধারায় আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত ৬ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আইনের ৭ ধারা (অপহরণ): অপহরণের দায়ে তাকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।

আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, উভয় সাজা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে। রায় ঘোষণার পরপরই কঠোর পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত সালামকে চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট এম এম শাহজাহান মুকুল বলেন:
“বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্ষণের যে ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এই কঠোর রায় তা রোধে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। ভুয়া কাবিননামা বানিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে যে জঘন্য অপরাধ আসামি করেছে, তার যোগ্য শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। আমরা এই রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”
এদিকে রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবার আদালতের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ায় বিচারকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, এই রায় দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ নির্মূল হবে।