০৫:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধবিরতি করে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ এড়ালেন বঠে, তবে দিতে হচ্ছে চড়া মূল্য

 

এনামুল হক রাশেদীঃ

★ গত মঙ্গলবার সকালেও পরিস্থিতি অনেক জঠিল ছিল, ওই সময় ট্রাম্প ইরানি সভ্যতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। যদি এই যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিও আনে, তবু ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বদলে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্তে তিনি তাৎক্ষণিক সংকট থেকে রেহাই পেলেও রাজনৈতিকভাবে তাকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।

ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত’ শান্তি চুক্তির পথে অনেক দূর এগিয়েছে। আলোচনার সুযোগ তৈরি করতেই তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়েছেন।

এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, রাত ৮টার মধ্যে সমঝোতা না হলে ইরানের জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে, যা পরিস্থিতিতে তীব্র স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করেছিল।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে শর্তঃ

যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরানকে সব ধরনের সংঘাত বন্ধ করতে হবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রনালী পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। ইরান এসব শর্ত মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছে, যদিও তারা বলছে—এই জলপথের ওপর তাদের ‘কর্তৃত্ব’ এখনো বজায় রয়েছে।

এই সমঝোতায় ট্রাম্প একটি কঠিন সংকট থেকে আপাতত রেহাই পেলেন। কারণ এর আগে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—‘আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা বিলীন হয়ে যেতে পারে।’ ফলে তাকে হয় যুদ্ধ শুরু করতে হতো, না হয় নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতো।

আলোচনার পথে দুই সপ্তাহঃ

আগামী দুই সপ্তাহ দুই দেশ আলোচনায় বসবে এবং একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার পথ সহজ হবে না।

তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারের সূচকও বেড়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে সমালোচনার ঝড়ঃ

যুদ্ধবিরতির আগের দিনই ট্রাম্প ইরানি সভ্যতাকে ‘চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দেন। এমন নজিরবিহীন বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ডেমোক্র্যাট নেতা ও সিনেটর Chuck Schumer বলেন, রিপাবলিকানদের মধ্যে যারা এই যুদ্ধ থামানোর পক্ষে দাঁড়াবেন না, তাদের চরম মূল্য দিতে হবে।

কংগ্রেস সদস্য জ্যাকুইন ক্যাস্ট্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, প্রেসিডেন্টের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটছে এবং তিনি দেশ পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নন।

এমনকি রিপাবলিকান দলের মধ্যেও ভিন্নমত দেখা গেছে। জর্জিয়ার কংগ্রেস সদস্য অস্টিন স্কট বিবিসিকে বলেন, একটি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ছাড়া উইসকনসিনের সিনেটর রন জনসন বলেন, ট্রাম্প যদি হামলা চালিয়ে যেতেন, সেটি হতো ‘একটি বিরাট ভুল’। একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন আলাস্কার সিনেটর লিজা মারকুয়াস্কি।

ইরানের প্রতিক্রিয়াঃ

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যিদ আব্বাস আরগাছি জানিয়েছেন, ইরান আপাতত ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ বন্ধ রাখবে। তবে হরমুজ প্রনালী দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের মূল কাঠামো মেনে নিয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রাখা।

সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান নয়ঃ

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি ট্রাম্পের জন্য আপাতত একটি রাজনৈতিক স্বস্তি এনে দিলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থা এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর তেহরানের প্রভাবসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে দুই সপ্তাহের আলোচনায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকেই এখন নজর বিশ্ব রাজনীতির।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

যুদ্ধবিরতি করে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ এড়ালেন বঠে, তবে দিতে হচ্ছে চড়া মূল্য

Update Time : ০২:১৯:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

 

এনামুল হক রাশেদীঃ

★ গত মঙ্গলবার সকালেও পরিস্থিতি অনেক জঠিল ছিল, ওই সময় ট্রাম্প ইরানি সভ্যতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। যদি এই যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিও আনে, তবু ইরান যুদ্ধ ও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বদলে দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্তে তিনি তাৎক্ষণিক সংকট থেকে রেহাই পেলেও রাজনৈতিকভাবে তাকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।

ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৩২ মিনিটে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি ‘চূড়ান্ত’ শান্তি চুক্তির পথে অনেক দূর এগিয়েছে। আলোচনার সুযোগ তৈরি করতেই তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়েছেন।

এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, রাত ৮টার মধ্যে সমঝোতা না হলে ইরানের জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে, যা পরিস্থিতিতে তীব্র স্নায়ুচাপ সৃষ্টি করেছিল।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে শর্তঃ

যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইরানকে সব ধরনের সংঘাত বন্ধ করতে হবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রনালী পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। ইরান এসব শর্ত মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছে, যদিও তারা বলছে—এই জলপথের ওপর তাদের ‘কর্তৃত্ব’ এখনো বজায় রয়েছে।

এই সমঝোতায় ট্রাম্প একটি কঠিন সংকট থেকে আপাতত রেহাই পেলেন। কারণ এর আগে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—‘আজ রাতে একটি আস্ত সভ্যতা বিলীন হয়ে যেতে পারে।’ ফলে তাকে হয় যুদ্ধ শুরু করতে হতো, না হয় নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতো।

আলোচনার পথে দুই সপ্তাহঃ

আগামী দুই সপ্তাহ দুই দেশ আলোচনায় বসবে এবং একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনার পথ সহজ হবে না।

তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারের সূচকও বেড়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে সমালোচনার ঝড়ঃ

যুদ্ধবিরতির আগের দিনই ট্রাম্প ইরানি সভ্যতাকে ‘চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দেন। এমন নজিরবিহীন বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ডেমোক্র্যাট নেতা ও সিনেটর Chuck Schumer বলেন, রিপাবলিকানদের মধ্যে যারা এই যুদ্ধ থামানোর পক্ষে দাঁড়াবেন না, তাদের চরম মূল্য দিতে হবে।

কংগ্রেস সদস্য জ্যাকুইন ক্যাস্ট্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, প্রেসিডেন্টের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটছে এবং তিনি দেশ পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নন।

এমনকি রিপাবলিকান দলের মধ্যেও ভিন্নমত দেখা গেছে। জর্জিয়ার কংগ্রেস সদস্য অস্টিন স্কট বিবিসিকে বলেন, একটি সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ছাড়া উইসকনসিনের সিনেটর রন জনসন বলেন, ট্রাম্প যদি হামলা চালিয়ে যেতেন, সেটি হতো ‘একটি বিরাট ভুল’। একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন আলাস্কার সিনেটর লিজা মারকুয়াস্কি।

ইরানের প্রতিক্রিয়াঃ

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যিদ আব্বাস আরগাছি জানিয়েছেন, ইরান আপাতত ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’ বন্ধ রাখবে। তবে হরমুজ প্রনালী দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের মূল কাঠামো মেনে নিয়েছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে রাখা।

সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী সমাধান নয়ঃ

বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি ট্রাম্পের জন্য আপাতত একটি রাজনৈতিক স্বস্তি এনে দিলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থা এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর তেহরানের প্রভাবসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে দুই সপ্তাহের আলোচনায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেদিকেই এখন নজর বিশ্ব রাজনীতির।