০৮:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরীক্ষা দিতে গিয়ে কলেজ থেকে ফিরে এলেন সামিয়া লাশ

 

কামরুল ০১৮৮৩০৮৮০৮৪

পরীক্ষা দিতে কলেজে গিয়েছিলেন সামিয়া, কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে। পাঁচদিন আগে গত ৪ এপ্রিল সামিয়ার জন্মদিন পালিত হয়েছে পরিবার পরিজন নিয়ে, বাড়িতে ছিল সেই উৎসবের আমেজ। আগামী ৩০ এপ্রিল সামিয়ার একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে। কেনাকাটা, সাজগোজসহ নানা পরিকল্পনা চলছিল সেই বিয়ে নিয়ে। সবকিছু মিলে উৎসবের আমেজে ভাসা একটি পরিবারকে সামিয়ার মৃত্যু শোকের সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে। সামিয়া হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে গতকাল দুপুর আড়াইটায় প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান সামিয়া। তার অকাল মৃত্যুতে শুধু পরিবারই নয়, পুরো এলাকা এখন শোকের সাগরে ভাসছে। সামিয়ার বাসা রাহাত্তারপুলের ফুলতলীর শাহ আমানত হাউজিং সোসাইটিতে। পুলিশ বলেছে, হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের অনার্স (অর্থনীতি) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সামিয়া জাহান তানিশা (২২) পরীক্ষা শেষে বন্ধুর সাথে পতেঙ্গা বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে গতকাল দুপুর আড়াইটা নাগাদ পতেঙ্গা–লালখান বাজারমুখী ফ্লাইওভারের বারিক বিল্ডিং এলাকায় অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণহারা প্রাইভেট কারটি এক্সপ্রেসওয়ের রেলিংয়ের সাথে ধাক্কা লেগে দুমড়ে মুছড়ে যায়। এই সময় গাড়ি থেকে ছিটকে পড়েন ফ্রন্ট সিটে বসা সামিয়া। ঘটনায় তার বন্ধু গাড়ির চালক সাইদুল আলমও সামান্য আহত হয়েছেন। তাকে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
বন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, সামিয়া জাহান এবং তার বন্ধু সাইদুল আলম গতকাল একটি প্রাইভেট কারে (চট্টমেট্রো–গ–১১–৪০৩৪) গ পতেঙ্গায় বেড়াতে যাচ্ছিলেন। সাইদুলই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। বেশ পুরানো এবং মডিফাই করা গাড়িটি দ্রুত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায় বলে মন্তব্য করে পুলিশ বলেছে, গাড়িটি এক্সপ্রেসওয়ের রেলিংয়ে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে গাড়িটি দুমড়ে মুছড়ে যায় এবং ফ্রন্ট সিটে বসা সামিয়া ছিটকে পড়ে গুরুতরভাবে আহত হন। আহত হন গাড়ির চালক সাইদুলও। স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সামিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
সামিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বন্দর থানার এসআই এরশাদ মিয়া বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সামিয়া জাহান নিহত হয়েছেন। গাড়ির চালক সাইদুল আলম সামান্য আহত হয়েছেন। নিহত শিক্ষার্থীর মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে রাখা হয়েছে। আহত চালকও সেখানে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ জানায়, সামিয়ার বাবার নাম মোহাম্মদ আবু তালেব পাটোয়ারী ও মা নাসিমা সুলতানা। তাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। তবে তারা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরীতে বসবাস করছেন।
নিহত সামিয়ার মামা গিয়াস উদ্দিন শিকদার গতরাতে দৈনিক আজাদীকে বলেন, সামিয়া আজ পরীক্ষা দিতে কলেজে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাকে পতেঙ্গা এলাকায় নেওয়া হয়। তবে গাড়ির চালককে তাদের পরিবারের কেউ চেনেন না। বেলা আড়াইটার দিকে দুর্ঘটনার খবর পান তারা।
গিয়াস উদ্দিন শিকদার বলেন, সামিয়ারা তিন বোন ও এক ভাই। সামিয়া ভাই–বোনদের মধ্যে তৃতীয়। তার বড়ভাই মাহমুদ সৌদি আরবে বাংলাদেশ এম্বেসিতে চাকরি করেন। আগামী ৩০ এপ্রিল তার বিয়ে। এই বিয়ে নিয়ে সামিয়ার উৎসাহ পুরো পরিবারকে মাতিয়ে রেখেছিল। সামিয়ার বাবা সরকারি কর্মকর্তা, বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন।
সামিয়ার পরিবার ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যা। অভিযুক্ত সাইদুল আলম সামিয়াকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে গিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেন তারা। পরিবারের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাইদুল আলমকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে।অ
মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে শোকে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে পরিবার। মা নাসিমা সুলতানা বারবার চিৎকার করে কাঁদছিলেন, মোবাইলে মেয়ের জন্মদিনের ছবি একেওকে দেখাচ্ছিলেন। ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে সামিয়া কি কি পরিকল্পনা করেছিলো তাও জানাচ্ছিলেন তিনি। সামিয়ার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবু তালেবের কণ্ঠে শুধু অসহায় আর্তনাদ। তিনি বলেন, এই মেডিকেলেই আমার মেয়ের জন্ম হয়েছিল, আজ সেই মেডিকেলের লাশঘরে আমার মেয়ে পড়ে আছে।
সামিয়ার বন্ধু সাইদুল আলম চান্দগাঁওয়ের বহদ্দারহাটের বারৈপাড়ার বাসিন্দা। তার পিতার নাম শাহ আলম। সাইদুল কাতার প্রবাসী বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ বিষয়ে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, আমাদের হেফাজতে সাইদুলের চিকিৎসা চলছে। নিহত সামিয়ার পরিবারের সদস্যরা থানায় এলে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। তবে গতরাত ১০টা পর্যন্ত কেউ থানায় আসেননি বলেও ওসি জানান।
এদিকে এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলকারী নগরবাসীর অভিযোগ, এখানে প্রায়শ ঘটছে দুর্ঘটনা। এক্সপ্রেসওয়েতে বেপরোয়া গতির নিয়ন্ত্রণ দরকার। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি তারা অনতিবিলম্বে ব্যবস্থাগ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

পরীক্ষা দিতে গিয়ে কলেজ থেকে ফিরে এলেন সামিয়া লাশ

Update Time : ০২:১৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

 

কামরুল ০১৮৮৩০৮৮০৮৪

পরীক্ষা দিতে কলেজে গিয়েছিলেন সামিয়া, কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে। পাঁচদিন আগে গত ৪ এপ্রিল সামিয়ার জন্মদিন পালিত হয়েছে পরিবার পরিজন নিয়ে, বাড়িতে ছিল সেই উৎসবের আমেজ। আগামী ৩০ এপ্রিল সামিয়ার একমাত্র ভাইয়ের বিয়ে। কেনাকাটা, সাজগোজসহ নানা পরিকল্পনা চলছিল সেই বিয়ে নিয়ে। সবকিছু মিলে উৎসবের আমেজে ভাসা একটি পরিবারকে সামিয়ার মৃত্যু শোকের সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে। সামিয়া হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে গতকাল দুপুর আড়াইটায় প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারান সামিয়া। তার অকাল মৃত্যুতে শুধু পরিবারই নয়, পুরো এলাকা এখন শোকের সাগরে ভাসছে। সামিয়ার বাসা রাহাত্তারপুলের ফুলতলীর শাহ আমানত হাউজিং সোসাইটিতে। পুলিশ বলেছে, হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের অনার্স (অর্থনীতি) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সামিয়া জাহান তানিশা (২২) পরীক্ষা শেষে বন্ধুর সাথে পতেঙ্গা বেড়াতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে গতকাল দুপুর আড়াইটা নাগাদ পতেঙ্গা–লালখান বাজারমুখী ফ্লাইওভারের বারিক বিল্ডিং এলাকায় অতিরিক্ত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণহারা প্রাইভেট কারটি এক্সপ্রেসওয়ের রেলিংয়ের সাথে ধাক্কা লেগে দুমড়ে মুছড়ে যায়। এই সময় গাড়ি থেকে ছিটকে পড়েন ফ্রন্ট সিটে বসা সামিয়া। ঘটনায় তার বন্ধু গাড়ির চালক সাইদুল আলমও সামান্য আহত হয়েছেন। তাকে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
বন্দর থানা পুলিশ জানিয়েছে, সামিয়া জাহান এবং তার বন্ধু সাইদুল আলম গতকাল একটি প্রাইভেট কারে (চট্টমেট্রো–গ–১১–৪০৩৪) গ পতেঙ্গায় বেড়াতে যাচ্ছিলেন। সাইদুলই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। বেশ পুরানো এবং মডিফাই করা গাড়িটি দ্রুত গতির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায় বলে মন্তব্য করে পুলিশ বলেছে, গাড়িটি এক্সপ্রেসওয়ের রেলিংয়ে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে গাড়িটি দুমড়ে মুছড়ে যায় এবং ফ্রন্ট সিটে বসা সামিয়া ছিটকে পড়ে গুরুতরভাবে আহত হন। আহত হন গাড়ির চালক সাইদুলও। স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সামিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
সামিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বন্দর থানার এসআই এরশাদ মিয়া বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় সামিয়া জাহান নিহত হয়েছেন। গাড়ির চালক সাইদুল আলম সামান্য আহত হয়েছেন। নিহত শিক্ষার্থীর মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হাসপাতালে রাখা হয়েছে। আহত চালকও সেখানে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ জানায়, সামিয়ার বাবার নাম মোহাম্মদ আবু তালেব পাটোয়ারী ও মা নাসিমা সুলতানা। তাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। তবে তারা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরীতে বসবাস করছেন।
নিহত সামিয়ার মামা গিয়াস উদ্দিন শিকদার গতরাতে দৈনিক আজাদীকে বলেন, সামিয়া আজ পরীক্ষা দিতে কলেজে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাকে পতেঙ্গা এলাকায় নেওয়া হয়। তবে গাড়ির চালককে তাদের পরিবারের কেউ চেনেন না। বেলা আড়াইটার দিকে দুর্ঘটনার খবর পান তারা।
গিয়াস উদ্দিন শিকদার বলেন, সামিয়ারা তিন বোন ও এক ভাই। সামিয়া ভাই–বোনদের মধ্যে তৃতীয়। তার বড়ভাই মাহমুদ সৌদি আরবে বাংলাদেশ এম্বেসিতে চাকরি করেন। আগামী ৩০ এপ্রিল তার বিয়ে। এই বিয়ে নিয়ে সামিয়ার উৎসাহ পুরো পরিবারকে মাতিয়ে রেখেছিল। সামিয়ার বাবা সরকারি কর্মকর্তা, বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন।
সামিয়ার পরিবার ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যা। অভিযুক্ত সাইদুল আলম সামিয়াকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে গিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেন তারা। পরিবারের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাইদুল আলমকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে।অ
মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে শোকে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে পরিবার। মা নাসিমা সুলতানা বারবার চিৎকার করে কাঁদছিলেন, মোবাইলে মেয়ের জন্মদিনের ছবি একেওকে দেখাচ্ছিলেন। ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে সামিয়া কি কি পরিকল্পনা করেছিলো তাও জানাচ্ছিলেন তিনি। সামিয়ার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবু তালেবের কণ্ঠে শুধু অসহায় আর্তনাদ। তিনি বলেন, এই মেডিকেলেই আমার মেয়ের জন্ম হয়েছিল, আজ সেই মেডিকেলের লাশঘরে আমার মেয়ে পড়ে আছে।
সামিয়ার বন্ধু সাইদুল আলম চান্দগাঁওয়ের বহদ্দারহাটের বারৈপাড়ার বাসিন্দা। তার পিতার নাম শাহ আলম। সাইদুল কাতার প্রবাসী বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ বিষয়ে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম বলেন, আমাদের হেফাজতে সাইদুলের চিকিৎসা চলছে। নিহত সামিয়ার পরিবারের সদস্যরা থানায় এলে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। তবে গতরাত ১০টা পর্যন্ত কেউ থানায় আসেননি বলেও ওসি জানান।
এদিকে এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলকারী নগরবাসীর অভিযোগ, এখানে প্রায়শ ঘটছে দুর্ঘটনা। এক্সপ্রেসওয়েতে বেপরোয়া গতির নিয়ন্ত্রণ দরকার। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি তারা অনতিবিলম্বে ব্যবস্থাগ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।