
বিশেষ প্রতিনিধি প্রতিনিধিঃ
একজন ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের মাসিক আয় সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা। এই সামান্য আয়ে যেখানে সংসার চালানোই চ্যালেঞ্জ, সেখানে সাভার–আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আফজাল মিয়া কীভাবে কোটি টাকার মালিক হলেন—এই প্রশ্ন এখন আর গোপন নয়, বরং এলাকাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে।
জিরো থেকে হিরো—নাকি আঙুল ফুলে কলাগাছ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মাঠে নামে সাংবাদিকদের অনুসন্ধান টিম।
বেতন ২৪ হাজার, সম্পদ কোটি টাকা—বৈপরীত্যে প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবতা
সরকারি নথি অনুযায়ী, একজন ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের মূল বেতন ১০ হাজার ২০০ টাকা। ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যোগ করে মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা। অথচ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই সীমিত আয়ের বিপরীতে আফজাল মিয়ার রয়েছে কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ।
এই আর্থিক বৈপরীত্য স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
উত্তরায় বিলাসবহুল তিনতলা বাড়ি, স্ত্রীর নামে একাধিক সম্পত্তির অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা দক্ষিণ খান এলাকায় আফজাল মিয়ার নামে রয়েছে একটি বিলাসবহুল তিনতলা ভবন। পাশাপাশি তার স্ত্রীর নামেও একাধিক জমি ও সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
স্থানীয়দের অভিযোগ—এই সম্পদ কোনো পারিবারিক উত্তরাধিকার বা বৈধ ব্যবসার ফল নয়; বরং রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেই গড়ে তোলা হয়েছে এই বিত্ত-বৈভব।
ক্ষমতার ছায়ায় উত্থান: ২০১৪ সাল থেকেই বদলে যায় জীবনধারা
তথ্য অনুযায়ী, আফজাল মিয়া ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমিনবাজার ইউনিয়ন পরিষদ ও সাভার সদর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় থেকেই তার জীবনযাত্রায় আসে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, তৎকালীন জনপ্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগে তিনি প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। বর্তমানে তিনি কর্মরত আশুলিয়া ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদে।
নাগরিক সেবার নামে ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ
ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ঘুষ আদায়ের একাধিক অভিযোগ উঠেছে সচিব আফজাল মিয়ার বিরুদ্ধে।
এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের জানান,
“নাগরিক সনদ দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে কোনো কাজই হয় না।”
স্থানীয়দের দাবি, জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রেই রয়েছে অঘোষিত রেট তালিকা, যা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে।
সাংবাদিকের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে রহস্য
এদিকে, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে একজন সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আফজাল মিয়াকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন বলে জানা গেছে। স্ট্যাটাসটি প্রকাশের কিছুক্ষণ পর থেকেই সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পোস্টটি কেন সরানো হয়েছে বা কী কারণে এটি অনুপস্থিত—সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিক মহল ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে নীরবতা, ফোন বন্ধ
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার আফজাল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ইউনিয়ন পরিষদে সরেজমিন অনুসন্ধানেও তাকে সাংবাদিকদের সামনে আসতে দেখা যায়নি।
এই নীরবতা অভিযোগের মাত্রাকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি
একজন সরকারি কর্মচারীর সীমিত আয়ের বিপরীতে এতো বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
তাদের প্রশ্ন—
এই সম্পদের উৎস কী?
আয়কর নথিতে কি এসব সম্পদের উল্লেখ রয়েছে?
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কবে বিষয়টি তদন্তে নেবে?
শেষ কথা: অনুসন্ধান এখানেই শেষ নয়
এই প্রতিবেদন কেবল শুরু।
পরবর্তী পর্বে তুলে ধরা হবে—
ঘুষ বাণিজ্যের আরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ,
প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য,
এবং অদৃশ্য আয়ের নেপথ্যের প্রভাবশালী যোগসূত্র
প্রতিনিধির নাম 



















