০৮:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সর্ববৃহৎ অভিযান যৌথ বাহিনীর

 

কামরুল ইসলাম সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

চট্টগ্রামের ইতিহাসে সন্ত্রাস দমনে পরিচালিত ‘সর্ববৃহৎ’ অভিযানে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে ‘নিজেদের কর্তৃত্ব’ প্রতিষ্ঠা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আটক করা হয়েছে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে এবং উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি–বিদেশি অস্ত্র। গতকাল সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই সাঁড়াশি অভিযানে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আকাশ ও স্থলপথে নজরদারি চালানো হয়। প্রায় ৪ হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয় এই অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার সন্ত্রাস দমনে এত বড়, সমন্বিত ও পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনার নজির নেই বলে প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে।

জানা গেছে, অভিযানকালে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের বিষয়ে আজ ডিআইজি ব্রিফ করবেন।

ইতিপূর্বে চার দফা চেষ্টা করে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনা করতে না পারলেও পঞ্চমবারে অভিযান চালানো হয়। জঙ্গল সলিমপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব এবং পুলিশের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গতকাল সোমবার ভোর ৫টা থেকে জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকায় সমন্বিত এই অভিযান শুরু হয়। এতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা অংশ নেন। অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনা সদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ জন এপিবিএন, ৪০০ র‌্যাব এবং ১২০ জন বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর চারটি সাঁজোয়া যানসহ বড় একটি সেনা বহর মোতায়েন করা হয়। সকাল ১০টার পর থেকে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি জোরদার করা হয়। পাশাপাশি পাহাড়ি ঝোপঝাড় বা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক শনাক্তে ডগ স্কোয়াডও কাজে লাগানো হয়। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে উপস্থিত ছিলেন।

অভিযান চলাকালে চট্টগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকেরা জঙ্গল সলিমপুরে যেতে চাইলেও নিরাপত্তার কথা বলে প্রশাসন বাধা দেয়। বেলা ১১টা নাগাদ বায়েজিদ লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখে অভিযানের অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। তবে মোট সংখ্যা অভিযান শেষ হলে জানানো যাবে।

স্থানীয়দের কাছে ‘ছিন্নমূল মুখ’ নামে পরিচিত ওই স্থানে দাঁড়িয়ে গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ। তিনি রাষ্ট্রের ভেতরে অন্য রাষ্ট্র হয়ে ওঠা জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এই অভিযান চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, এই কর্তৃত্ব ধরে রাখতে এলাকায় পুলিশ ও র‌্যাবের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন বলেন, ভোর থেকে অভিযান শুরু হয়েছে এবং পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা এতে অংশ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে কি না কিংবা উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

সেহেরির পরপর শুরু হওয়া অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধারে মাঠে নামেন। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতিগুলোতে তল্লাশি চালায়, অন্য একটি দল পাহাড়ি পথ ধরে ভেতরের দিকে অগ্রসর হয়। সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতে আগে থেকে চেকপোস্ট বসানো হয়, যাতে কেউ এলাকা ছেড়ে পালাতে না পারে।

অভিযান চলাকালে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া না হলেও এলাকায় গিয়ে শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। সন্ত্রাসীদের একটি অংশ অভিযানের খবর আগে পেয়ে রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা বন্ধ করে দেয়, কোথাও বড় ট্রাক রেখে ব্যারিকেড তৈরি করে, আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে ও নালার স্ল্যাব খুলে ফেলে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগে পেয়ে সন্ত্রাসীরা এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বিশেষ করে আলীনগর এলাকায় প্রবেশ ঠেকাতে প্রধান সড়কে একটি ট্রাক রেখে ব্যারিকেড দেওয়া হয় এবং একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। পরে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ট্রাক সরিয়ে এবং ভাঙা কালভার্ট ইট–বালু দিয়ে ভরাট করে ভেতরে প্রবেশ করেন।

প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে দুর্গম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে এবং এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য। এই দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। পাহাড়ি ও দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অবৈধ অস্ত্র মজুত এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আত্মগোপনের অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরে বর্তমানে দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ সক্রিয় বলে জানা গেছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত র‌্যাব–৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।

১৯ জানুয়ারি র‌্যাব সদস্যরা অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় র‌্যাবের উপ–সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং কয়েকজন র‌্যাব সদস্য আহত হন। সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের করা মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সর্ববৃহৎ অভিযান যৌথ বাহিনীর

Update Time : ০৪:৩৩:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

 

কামরুল ইসলাম সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

চট্টগ্রামের ইতিহাসে সন্ত্রাস দমনে পরিচালিত ‘সর্ববৃহৎ’ অভিযানে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে ‘নিজেদের কর্তৃত্ব’ প্রতিষ্ঠা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আটক করা হয়েছে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে এবং উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি–বিদেশি অস্ত্র। গতকাল সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই সাঁড়াশি অভিযানে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আকাশ ও স্থলপথে নজরদারি চালানো হয়। প্রায় ৪ হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয় এই অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারই অভিযানের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার সন্ত্রাস দমনে এত বড়, সমন্বিত ও পরিকল্পিত অভিযান পরিচালনার নজির নেই বলে প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে।

জানা গেছে, অভিযানকালে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের বিষয়ে আজ ডিআইজি ব্রিফ করবেন।

ইতিপূর্বে চার দফা চেষ্টা করে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনা করতে না পারলেও পঞ্চমবারে অভিযান চালানো হয়। জঙ্গল সলিমপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব এবং পুলিশের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গতকাল সোমবার ভোর ৫টা থেকে জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকায় সমন্বিত এই অভিযান শুরু হয়। এতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা অংশ নেন। অভিযানে প্রায় ৫৫০ জন সেনা সদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ জন এপিবিএন, ৪০০ র‌্যাব এবং ১২০ জন বিজিবি সদস্য অংশ নিয়েছেন। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর চারটি সাঁজোয়া যানসহ বড় একটি সেনা বহর মোতায়েন করা হয়। সকাল ১০টার পর থেকে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি জোরদার করা হয়। পাশাপাশি পাহাড়ি ঝোপঝাড় বা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক শনাক্তে ডগ স্কোয়াডও কাজে লাগানো হয়। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে উপস্থিত ছিলেন।

অভিযান চলাকালে চট্টগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকেরা জঙ্গল সলিমপুরে যেতে চাইলেও নিরাপত্তার কথা বলে প্রশাসন বাধা দেয়। বেলা ১১টা নাগাদ বায়েজিদ লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখে অভিযানের অগ্রগতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। তবে মোট সংখ্যা অভিযান শেষ হলে জানানো যাবে।

স্থানীয়দের কাছে ‘ছিন্নমূল মুখ’ নামে পরিচিত ওই স্থানে দাঁড়িয়ে গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ। তিনি রাষ্ট্রের ভেতরে অন্য রাষ্ট্র হয়ে ওঠা জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এই অভিযান চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, এই কর্তৃত্ব ধরে রাখতে এলাকায় পুলিশ ও র‌্যাবের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন বলেন, ভোর থেকে অভিযান শুরু হয়েছে এবং পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা এতে অংশ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে কি না কিংবা উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

সেহেরির পরপর শুরু হওয়া অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধারে মাঠে নামেন। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতিগুলোতে তল্লাশি চালায়, অন্য একটি দল পাহাড়ি পথ ধরে ভেতরের দিকে অগ্রসর হয়। সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতে আগে থেকে চেকপোস্ট বসানো হয়, যাতে কেউ এলাকা ছেড়ে পালাতে না পারে।

অভিযান চলাকালে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া না হলেও এলাকায় গিয়ে শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। সন্ত্রাসীদের একটি অংশ অভিযানের খবর আগে পেয়ে রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা বন্ধ করে দেয়, কোথাও বড় ট্রাক রেখে ব্যারিকেড তৈরি করে, আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে ও নালার স্ল্যাব খুলে ফেলে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগে পেয়ে সন্ত্রাসীরা এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বিশেষ করে আলীনগর এলাকায় প্রবেশ ঠেকাতে প্রধান সড়কে একটি ট্রাক রেখে ব্যারিকেড দেওয়া হয় এবং একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। পরে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ট্রাক সরিয়ে এবং ভাঙা কালভার্ট ইট–বালু দিয়ে ভরাট করে ভেতরে প্রবেশ করেন।

প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে দুর্গম হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে এবং এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য। এই দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী। পাহাড়ি ও দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অবৈধ অস্ত্র মজুত এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আত্মগোপনের অভিযোগ রয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুরে বর্তমানে দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ সক্রিয় বলে জানা গেছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত র‌্যাব–৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।

১৯ জানুয়ারি র‌্যাব সদস্যরা অভিযানে গেলে সন্ত্রাসীরা রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় র‌্যাবের উপ–সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং কয়েকজন র‌্যাব সদস্য আহত হন। সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের করা মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।