০৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের জ্বালানি অনিশ্চিয়তার মুখে

 

কামরুল ইসলাম সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) জন্য নির্ধারিত একটি মাদার ভ্যাসেল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়ে আছে। প্রণালি বন্ধ থাকায় এমটি নর্ডিক পলাঙ নামের জাহাজটি বাংলাদেশে রওনা হতে পারছে না। যুদ্ধে কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ইরান সেটি বন্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে নয়, এশিয়া–ইউরোপসহ পুরো বিশ্বের জ্বালানি সেক্টর টালমাটাল করে দিতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় অন্তত ৭শ তেলবাহী মাদার ট্যাংকার মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরগুলোতে আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে বিপিসির এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) বোঝাই একটি মাদার ভ্যাসেল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়েছে। ২ মার্চ নির্ধারিত সময়ে জাহাজটি বাংলাদেশের পথে রওনা হতে পারেনি। ফলে আমদানি সিডিউলে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বড় উৎস থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে। আগামী ২২ মার্চ আবুধাবির জেবল ধান্না বন্দর থেকে আরো এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে আরেকটি মাদার ভ্যাসেল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নৌ–নিরাপত্তা ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে সেই চালান সময়মতো পৌঁছাবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো ক্রুড অয়েল দেশে না পৌঁছালে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপর। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার এই শোধনাগারটি অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করে। কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের জ্বালানি বাজারে চাপ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে আপাতত দেশে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। বিপিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের অকটেন, ১৫ দিনের পেট্রোল, ২৮ দিনের ডিজেল, ৩০ দিনের জেট ফুয়েল, ৯৩ দিনের ফার্নেস অয়েল, ৪২ দিনের মেরিন ফুয়েল এবং ১৪০ দিনের কেরোসিন মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি রিফাইন্ড অয়েল মূলত সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছাচ্ছে। পূর্বমুখী সরবরাহ লাইনে এখনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবাহিত হয়। এই রুট দীর্ঘ সময় অচল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। সেক্ষেত্রে শুধু আমদানি ব্যয় নয়, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাও চাপে পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান মজুদ পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার মতো হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বড় জ্বালানি উৎসে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই বিকল্প আমদানি উৎস নিশ্চিত করা, মজুদ ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

দেশের জ্বালানি অনিশ্চিয়তার মুখে

Update Time : ১০:৫২:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

 

কামরুল ইসলাম সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) জন্য নির্ধারিত একটি মাদার ভ্যাসেল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়ে আছে। প্রণালি বন্ধ থাকায় এমটি নর্ডিক পলাঙ নামের জাহাজটি বাংলাদেশে রওনা হতে পারছে না। যুদ্ধে কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ইরান সেটি বন্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলে নয়, এশিয়া–ইউরোপসহ পুরো বিশ্বের জ্বালানি সেক্টর টালমাটাল করে দিতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় অন্তত ৭শ তেলবাহী মাদার ট্যাংকার মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরগুলোতে আটকা পড়ে আছে। এর মধ্যে বিপিসির এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড অয়েল) বোঝাই একটি মাদার ভ্যাসেল সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়েছে। ২ মার্চ নির্ধারিত সময়ে জাহাজটি বাংলাদেশের পথে রওনা হতে পারেনি। ফলে আমদানি সিডিউলে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বড় উৎস থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে। আগামী ২২ মার্চ আবুধাবির জেবল ধান্না বন্দর থেকে আরো এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে আরেকটি মাদার ভ্যাসেল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নৌ–নিরাপত্তা ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে সেই চালান সময়মতো পৌঁছাবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো ক্রুড অয়েল দেশে না পৌঁছালে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপর। চট্টগ্রামের পতেঙ্গার এই শোধনাগারটি অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করে। কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের জ্বালানি বাজারে চাপ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে আপাতত দেশে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। বিপিসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের অকটেন, ১৫ দিনের পেট্রোল, ২৮ দিনের ডিজেল, ৩০ দিনের জেট ফুয়েল, ৯৩ দিনের ফার্নেস অয়েল, ৪২ দিনের মেরিন ফুয়েল এবং ১৪০ দিনের কেরোসিন মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি রিফাইন্ড অয়েল মূলত সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছাচ্ছে। পূর্বমুখী সরবরাহ লাইনে এখনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবাহিত হয়। এই রুট দীর্ঘ সময় অচল থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। সেক্ষেত্রে শুধু আমদানি ব্যয় নয়, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাও চাপে পড়বে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান মজুদ পরিস্থিতি তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়ার মতো হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বড় জ্বালানি উৎসে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই বিকল্প আমদানি উৎস নিশ্চিত করা, মজুদ ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি