১২:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাসপোর্ট অফিসে ‘দরবেশ বাবা’ দৈনিক ৪ লাখ টাকার অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ

সাধন সাহা জয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

​বিদেশে যেতে অত্যাবশ্যকীয় পাসপোর্ট করতে এসে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষ। আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালালচক্র বা ‘চ্যানেল’।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের মূল হোতা অফিসের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির, যিনি আবেদনকারীদের কাছে ‘দরবেশ বাবা’ নামে পরিচিত।

​সরেজমিনে দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা আবেদনকারীরা নিজের কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি ফাইল জমা দিতে গেলে নানা ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে তাদের ফেরত দেওয়া হয়। অথচ একই কাগজপত্র ‘চ্যানেল’ বা দালালদের মাধ্যমে জমা দিলে মুহূর্তেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এর জন্য সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে আবেদনপ্রতি ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হয়।

ফাইল যত জরুরি হয়, টাকার পরিমাণও তত বেশি বাড়ানো হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই চ্যানেলের মাধ্যমে না গেলে কারোরই পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব হয় না।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে, যার বড় একটি অংশ আসে দালালদের মাধ্যমে। প্রতি আবেদনে গড়ে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করায় চক্রটির দৈনিক অবৈধ আয় হয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, এভাবে আদায়কৃত টাকা প্রতি বুধবার বিকেলে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়।

এর মূল অংশ উপপরিচালকের ড্রয়ারে যায় এবং বাকি অংশ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পদমর্যাদা অনুযায়ী ভাগ হয়। চক্রের এক সদস্যও স্বীকার করেছেন যে মোট আদায়ের ৫০ শতাংশ যায় উপপরিচালকের কাছে।

​অফিসের ভেতরে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণেরও চাঞ্চল্যকর প্রমাণ মিলেছে।

সরেজমিনে জহির নামের এক বহিরাগতকে অফিসের কম্পিউটারে বসে পাসপোর্টের কাজ করতে দেখা যায়। এমনকি তাকে সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের কক্ষেও যাতায়াত করতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে পুলিশের সহায়তায় আটকের পর উপপরিচালক শাহজাহান কবির তাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও ওই ব্যক্তি পরে দালালচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন।

এছাড়া উপসহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক ও হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনও এই চক্র পরিচালনায় সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

​এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, “পাসপোর্ট অফিস আমার আওতাধীন নয়। তবুও নাগরিকরা সমস্যার শিকার হলে আমরা ব্যবস্থা নেব। জেলায় অভিযোগ সেল আছে। জনগণকে সেখানে সমস্যার কথা জানানোর আহ্বান জানাই।”

​জেলা সুজনের সভাপতি কবি আব্দুল মান্নান বলেন, “পাসপোর্ট অফিসের ভোগান্তি বহুদিনের। সব লেভেলের কর্মকর্তা জড়িত বলেই মনে হয়। নইলে এত অভিযোগের পরও ব্যবস্থা হয় না কেন?”

​জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পাসপোর্ট অফিস নিয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত ও অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর অফিসটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তিনি আরও বলেন, “আমরা ব্যবস্থা নিতে চাইলে সাংবাদিক, সরকার সব জায়গা থেকেই চাপ আসে।”

​উল্লেখ্য, জুলাই মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রবাসীরা ৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।

জেলার মানুষের বিদেশমুখী প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে পাসপোর্ট অফিসটি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

পাসপোর্ট অফিসে ‘দরবেশ বাবা’ দৈনিক ৪ লাখ টাকার অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ

Update Time : ০৬:৩৪:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

সাধন সাহা জয়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

​বিদেশে যেতে অত্যাবশ্যকীয় পাসপোর্ট করতে এসে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষ। আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালালচক্র বা ‘চ্যানেল’।

অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের মূল হোতা অফিসের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির, যিনি আবেদনকারীদের কাছে ‘দরবেশ বাবা’ নামে পরিচিত।

​সরেজমিনে দেখা যায়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা আবেদনকারীরা নিজের কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি ফাইল জমা দিতে গেলে নানা ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে তাদের ফেরত দেওয়া হয়। অথচ একই কাগজপত্র ‘চ্যানেল’ বা দালালদের মাধ্যমে জমা দিলে মুহূর্তেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এর জন্য সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে আবেদনপ্রতি ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হয়।

ফাইল যত জরুরি হয়, টাকার পরিমাণও তত বেশি বাড়ানো হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই চ্যানেলের মাধ্যমে না গেলে কারোরই পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব হয় না।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে ৩০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে, যার বড় একটি অংশ আসে দালালদের মাধ্যমে। প্রতি আবেদনে গড়ে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করায় চক্রটির দৈনিক অবৈধ আয় হয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, এভাবে আদায়কৃত টাকা প্রতি বুধবার বিকেলে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়।

এর মূল অংশ উপপরিচালকের ড্রয়ারে যায় এবং বাকি অংশ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পদমর্যাদা অনুযায়ী ভাগ হয়। চক্রের এক সদস্যও স্বীকার করেছেন যে মোট আদায়ের ৫০ শতাংশ যায় উপপরিচালকের কাছে।

​অফিসের ভেতরে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণেরও চাঞ্চল্যকর প্রমাণ মিলেছে।

সরেজমিনে জহির নামের এক বহিরাগতকে অফিসের কম্পিউটারে বসে পাসপোর্টের কাজ করতে দেখা যায়। এমনকি তাকে সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের কক্ষেও যাতায়াত করতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে পুলিশের সহায়তায় আটকের পর উপপরিচালক শাহজাহান কবির তাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও ওই ব্যক্তি পরে দালালচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন।

এছাড়া উপসহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক ও হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনও এই চক্র পরিচালনায় সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

​এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, “পাসপোর্ট অফিস আমার আওতাধীন নয়। তবুও নাগরিকরা সমস্যার শিকার হলে আমরা ব্যবস্থা নেব। জেলায় অভিযোগ সেল আছে। জনগণকে সেখানে সমস্যার কথা জানানোর আহ্বান জানাই।”

​জেলা সুজনের সভাপতি কবি আব্দুল মান্নান বলেন, “পাসপোর্ট অফিসের ভোগান্তি বহুদিনের। সব লেভেলের কর্মকর্তা জড়িত বলেই মনে হয়। নইলে এত অভিযোগের পরও ব্যবস্থা হয় না কেন?”

​জেলা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পাসপোর্ট অফিস নিয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত ও অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর অফিসটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তিনি আরও বলেন, “আমরা ব্যবস্থা নিতে চাইলে সাংবাদিক, সরকার সব জায়গা থেকেই চাপ আসে।”

​উল্লেখ্য, জুলাই মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রবাসীরা ৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।

জেলার মানুষের বিদেশমুখী প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে পাসপোর্ট অফিসটি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছে।