০৭:৩১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাগজপত্রে মালিক, বাস্তবে গৃহহীন: চাঁদপুরে ৩১৪ শতাংশ জমি দখলে নিঃস্ব এক পরিবার

 

​শোয়েব হোসেন :
সরকারি খতিয়ানে নাম আছে, নিয়মিত খাজনা পরিশোধের বৈধ রশিদও রয়েছে। কিন্তু সব কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটিতে ঠাঁই হচ্ছে না ৬০ বছরের বিধবা রোকেয়া বেগমের। ক্ষমতার দাপট আর পেশিশক্তির কাছে হার মেনে চার ছেলেকে নিয়ে নিজের বসতবাড়ি থেকেই উচ্ছেদ হতে হয়েছে তাঁকে। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার চরমুঘুয়া গ্রামে ঘটেছে এই ঘটনা।

​জোরপূর্বক জমি দখলের শিকার ভুক্তভোগী রোকেয়া বেগম ও তাঁর চার ছেলে—মোঃ শাহীন (৪০), মোঃ মাসুম (৩৫), সাইফুল (৩২) ও মোঃ শরিফ হোসেন (২৫)—এখন দরজায় দরজায় ঘুরছেন আইনি প্রতিকারের আশায়।

​দিনদুপুরে দখল ও উচ্ছেদের অভিযোগ

আদালতে দাখিলকৃত আবেদন (নং- ১৪৮/২০২৬) ও অনুসন্ধানে জানা যায়, চরমুঘুয়া মৌজার সি.এস ২০, এস.এ ২০ এবং বি.এস ২১৩ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ০.৩১৪ একর জমির বৈধ ওয়ারিশ আব্দুর রশিদের পরিবারের সদস্যরা। ১৫৯৩৯(IX-I)/২০১৫-১৬ নম্বর মোকদ্দমা মূলে নিজস্ব নামে নামজারী ও জমা-খারিজ সম্পন্ন করে সরকার নির্ধারিত খাজনাও নিয়মিত দিয়ে আসছিলেন তারা। জমিতে বসতঘর ও পাকঘর নির্মাণ করে চারদিকে বেড়া দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছিলেন বিধবা রোকেয়া বেগম।

​তবে অভিযোগ উঠেছে, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি প্রকাশ্য দিবালোকে একই গ্রামের আঃ মন্নান ওরফে মনা, আবু তাহের শরীফ, আমির হোসেন, মানিক ও ইলিয়াছসহ একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি ওই নিরীহ পরিবারের ওপর চড়াও হয়। ঘরবাড়ি থেকে তাদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে পুরো জমি অবৈধভাবে নিজেদের দখলে নেয় হামলাকারীরা।

​দখলের আগে ও পরে মিথ্যা মামলা

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জমি দখলের পরিকল্পনা অনেক আগের। দখলের পূর্বেও একাধিকবার ওই পরিবারের বিরুদ্ধে আক্রোশপ্রসূতভাবে মিথ্যা মামলা করা হয়েছিল। আদালত সেসব মামলা তদন্ত শেষে ভিত্তিহীন হিসেবে খারিজ করে দেন। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হয়নি দখলকারীরা। জমি থেকে উচ্ছেদ করার পরও ভুক্তভোগীদের স্তব্ধ রাখতে নতুন করে মিথ্যা মামলার মাধ্যমে হয়রানি ও হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

​কাগজপত্রের ধারাবাহিকতা ও আইনি লড়াই

জমির মালিকানার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সি.এস ২০ নম্বর খতিয়ানের মূল মালিক চান্দ মিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে মুছলিম ও মকবুল আহাম্মদ জমি পান। পরবর্তীতে মুছলিমের ওয়ারিশ আব্দুর রশিদের নামে বি.এস ২১৩ নম্বর খতিয়ানে ২.১০ একর জমি রেকর্ড হয়। আব্দুর রশিদের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও সন্তানরা বিধি মোতাবেক ০.৩১৪ একর জমি নামজারী করে নিজেদের নামে খতিয়ান তৈরি করেন।

​ধারাবাহিকভাবে সব নথি বৈধ থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার জমি পুনরুদ্ধারে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’-এর ৮ ধারায় বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, চাঁদপুর আদালতে আবেদন জানিয়েছেন।

​ভুক্তভোগীদের আইনজীবী মোঃ সফিকুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, “আমার মক্কেলদের নামে নামজারী, খতিয়ান ও খাজনার সব ধরনের কাগজপত্র একশ ভাগ বৈধ। জমি দখলের উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষরা মিথ্যা মামলা দিয়ে পরিবারটিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ আইনে জোরপূর্বক দখল রোধে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। আমরা আইনের আশ্রয়ে দ্রুত জমি দখল পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করছি।”

​জোরপূর্বক দখলদারদের ভয়ে বর্তমানে নিজস্ব ভিটেমাটিতে প্রবেশ করতে পারছেন না রোকেয়া বেগম ও তাঁর সন্তানরা। ভিটেমাটি ফিরে পেতে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের আকুল আবেদন জানিয়েছেন অসহায় পরিবারটি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

কাগজপত্রে মালিক, বাস্তবে গৃহহীন: চাঁদপুরে ৩১৪ শতাংশ জমি দখলে নিঃস্ব এক পরিবার

Update Time : ০৫:২৭:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

 

​শোয়েব হোসেন :
সরকারি খতিয়ানে নাম আছে, নিয়মিত খাজনা পরিশোধের বৈধ রশিদও রয়েছে। কিন্তু সব কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও নিজের পৈত্রিক ভিটেমাটিতে ঠাঁই হচ্ছে না ৬০ বছরের বিধবা রোকেয়া বেগমের। ক্ষমতার দাপট আর পেশিশক্তির কাছে হার মেনে চার ছেলেকে নিয়ে নিজের বসতবাড়ি থেকেই উচ্ছেদ হতে হয়েছে তাঁকে। চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার চরমুঘুয়া গ্রামে ঘটেছে এই ঘটনা।

​জোরপূর্বক জমি দখলের শিকার ভুক্তভোগী রোকেয়া বেগম ও তাঁর চার ছেলে—মোঃ শাহীন (৪০), মোঃ মাসুম (৩৫), সাইফুল (৩২) ও মোঃ শরিফ হোসেন (২৫)—এখন দরজায় দরজায় ঘুরছেন আইনি প্রতিকারের আশায়।

​দিনদুপুরে দখল ও উচ্ছেদের অভিযোগ

আদালতে দাখিলকৃত আবেদন (নং- ১৪৮/২০২৬) ও অনুসন্ধানে জানা যায়, চরমুঘুয়া মৌজার সি.এস ২০, এস.এ ২০ এবং বি.এস ২১৩ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ০.৩১৪ একর জমির বৈধ ওয়ারিশ আব্দুর রশিদের পরিবারের সদস্যরা। ১৫৯৩৯(IX-I)/২০১৫-১৬ নম্বর মোকদ্দমা মূলে নিজস্ব নামে নামজারী ও জমা-খারিজ সম্পন্ন করে সরকার নির্ধারিত খাজনাও নিয়মিত দিয়ে আসছিলেন তারা। জমিতে বসতঘর ও পাকঘর নির্মাণ করে চারদিকে বেড়া দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছিলেন বিধবা রোকেয়া বেগম।

​তবে অভিযোগ উঠেছে, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি প্রকাশ্য দিবালোকে একই গ্রামের আঃ মন্নান ওরফে মনা, আবু তাহের শরীফ, আমির হোসেন, মানিক ও ইলিয়াছসহ একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি ওই নিরীহ পরিবারের ওপর চড়াও হয়। ঘরবাড়ি থেকে তাদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে পুরো জমি অবৈধভাবে নিজেদের দখলে নেয় হামলাকারীরা।

​দখলের আগে ও পরে মিথ্যা মামলা

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জমি দখলের পরিকল্পনা অনেক আগের। দখলের পূর্বেও একাধিকবার ওই পরিবারের বিরুদ্ধে আক্রোশপ্রসূতভাবে মিথ্যা মামলা করা হয়েছিল। আদালত সেসব মামলা তদন্ত শেষে ভিত্তিহীন হিসেবে খারিজ করে দেন। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হয়নি দখলকারীরা। জমি থেকে উচ্ছেদ করার পরও ভুক্তভোগীদের স্তব্ধ রাখতে নতুন করে মিথ্যা মামলার মাধ্যমে হয়রানি ও হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

​কাগজপত্রের ধারাবাহিকতা ও আইনি লড়াই

জমির মালিকানার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সি.এস ২০ নম্বর খতিয়ানের মূল মালিক চান্দ মিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দুই ছেলে মুছলিম ও মকবুল আহাম্মদ জমি পান। পরবর্তীতে মুছলিমের ওয়ারিশ আব্দুর রশিদের নামে বি.এস ২১৩ নম্বর খতিয়ানে ২.১০ একর জমি রেকর্ড হয়। আব্দুর রশিদের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও সন্তানরা বিধি মোতাবেক ০.৩১৪ একর জমি নামজারী করে নিজেদের নামে খতিয়ান তৈরি করেন।

​ধারাবাহিকভাবে সব নথি বৈধ থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার জমি পুনরুদ্ধারে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’-এর ৮ ধারায় বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, চাঁদপুর আদালতে আবেদন জানিয়েছেন।

​ভুক্তভোগীদের আইনজীবী মোঃ সফিকুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, “আমার মক্কেলদের নামে নামজারী, খতিয়ান ও খাজনার সব ধরনের কাগজপত্র একশ ভাগ বৈধ। জমি দখলের উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষরা মিথ্যা মামলা দিয়ে পরিবারটিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ আইনে জোরপূর্বক দখল রোধে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। আমরা আইনের আশ্রয়ে দ্রুত জমি দখল পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করছি।”

​জোরপূর্বক দখলদারদের ভয়ে বর্তমানে নিজস্ব ভিটেমাটিতে প্রবেশ করতে পারছেন না রোকেয়া বেগম ও তাঁর সন্তানরা। ভিটেমাটি ফিরে পেতে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের আকুল আবেদন জানিয়েছেন অসহায় পরিবারটি।