১০:২৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপ-সাংবাদিকতার ভিড়ে বিবেকের সংকট

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

​সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ চাকরি নয়; এটি একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। সাংবাদিকদের বলা হয়—জাতির বিবেক। অবহেলিত, নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের কথা তুলে ধরা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, দুর্নীতির অন্ধকার উন্মোচন করা এবং সত্যকে প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি।

​কিন্তু গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ ১১ বছরের পথচলায় আজ একটি প্রশ্ন বারবার মনে জাগে- আমরা আসলে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি?

​তথ্য সংগ্রহে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতে কখনো কখনো অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ হয়। যে পরিচয় একসময় আত্মমর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক ছিল, সমাজের একটি অংশের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেই পরিচয়ই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতা, ঝুঁকি ও ত্যাগের মুখোমুখি হয়েও সততা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা সত্যিই বেদনাদায়ক।

পরিচয় পত্র যেন বিক্রয়যোগ্য পন্য
​অর্থের বিনিময়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচয়পত্র বিতরণ।
​যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, লবিং ও প্রভাবের প্রাধান্য।​অদক্ষ ও অপেশাদার ব্যক্তিদের সাংবাদিক পরিচয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠা।

যানবাহনে ‘সাংবাদিক’ স্টিকার লাগিয়ে নিয়ম এড়িয়ে চলা বা প্রভাব বিস্তার।
অনলাইন পোর্টাল বা পত্রিকার পদ-পদবি ব্যবহার করে মাদক, চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা।
সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়।

প্রশাসন, থানা, ভূমি অফিস বা রেজিস্ট্রি অফিসে সাংবাদিক পরিচয়ে দালালি করা।
মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের কষ্টার্জিত সংবাদ হুবহু চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া।
রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে সত্যকে আড়াল করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার।

​জ্যেষ্ঠদের একাংশের ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে নীতি বিসর্জন।​জুনিয়রদের দিয়ে অনুসন্ধান করিয়ে পরে অর্থ বা প্রভাবের বিনিময়ে সেই সংবাদ চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি।

​এত সংকটের পরও অসংখ্য সৎ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক এখনো মাঠে কাজ করছেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরছেন এবং কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা ছাড়াই পেশার মর্যাদা রক্ষা করছেন। তাদের কারণেই সাংবাদিকতার ওপর মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাই সব সাংবাদিককে এক পাল্লায় মাপা অনুচিত; যারা সততার সঙ্গে কাজ করছেন, তাদের মূল্যায়ন ও সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।

​সাংবাদিকতার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে নিজের ভেতর থেকেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে:ভুয়া পরিচয়ধারী, চাঁদাবাজ ও ব্ল্যাকমেইলারদের বিরুদ্ধে পেশাগতভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া।
নিয়োগ ও আইডি কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া।
প্রবীণ ও সিনিয়র সাংবাদিকদের এগিয়ে এসে তরুণদের সঠিক নীতি-নৈতিকতার পাঠ দেওয়া।

সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত ক্ষমতার ঢাল নয়; এটি মানুষের কথা বলার দায়িত্ব। অপসাংবাদিকতার পচন যত গভীরই হোক, সত্যকে মুছে ফেলা যায় না। সততা, দায়িত্ববোধ ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমেই সাংবাদিকতার হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

অপ-সাংবাদিকতার ভিড়ে বিবেকের সংকট

Update Time : ০৪:২৯:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

​সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ চাকরি নয়; এটি একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। সাংবাদিকদের বলা হয়—জাতির বিবেক। অবহেলিত, নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের কথা তুলে ধরা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, দুর্নীতির অন্ধকার উন্মোচন করা এবং সত্যকে প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার মূল শক্তি।

​কিন্তু গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ ১১ বছরের পথচলায় আজ একটি প্রশ্ন বারবার মনে জাগে- আমরা আসলে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি?

​তথ্য সংগ্রহে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতে কখনো কখনো অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ হয়। যে পরিচয় একসময় আত্মমর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক ছিল, সমাজের একটি অংশের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেই পরিচয়ই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতা, ঝুঁকি ও ত্যাগের মুখোমুখি হয়েও সততা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা সত্যিই বেদনাদায়ক।

পরিচয় পত্র যেন বিক্রয়যোগ্য পন্য
​অর্থের বিনিময়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচয়পত্র বিতরণ।
​যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, লবিং ও প্রভাবের প্রাধান্য।​অদক্ষ ও অপেশাদার ব্যক্তিদের সাংবাদিক পরিচয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠা।

যানবাহনে ‘সাংবাদিক’ স্টিকার লাগিয়ে নিয়ম এড়িয়ে চলা বা প্রভাব বিস্তার।
অনলাইন পোর্টাল বা পত্রিকার পদ-পদবি ব্যবহার করে মাদক, চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা।
সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়।

প্রশাসন, থানা, ভূমি অফিস বা রেজিস্ট্রি অফিসে সাংবাদিক পরিচয়ে দালালি করা।
মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের কষ্টার্জিত সংবাদ হুবহু চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া।
রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে সত্যকে আড়াল করে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার।

​জ্যেষ্ঠদের একাংশের ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে নীতি বিসর্জন।​জুনিয়রদের দিয়ে অনুসন্ধান করিয়ে পরে অর্থ বা প্রভাবের বিনিময়ে সেই সংবাদ চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি।

​এত সংকটের পরও অসংখ্য সৎ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক এখনো মাঠে কাজ করছেন। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরছেন এবং কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা ছাড়াই পেশার মর্যাদা রক্ষা করছেন। তাদের কারণেই সাংবাদিকতার ওপর মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাই সব সাংবাদিককে এক পাল্লায় মাপা অনুচিত; যারা সততার সঙ্গে কাজ করছেন, তাদের মূল্যায়ন ও সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।

​সাংবাদিকতার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে নিজের ভেতর থেকেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে:ভুয়া পরিচয়ধারী, চাঁদাবাজ ও ব্ল্যাকমেইলারদের বিরুদ্ধে পেশাগতভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া।
নিয়োগ ও আইডি কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া।
প্রবীণ ও সিনিয়র সাংবাদিকদের এগিয়ে এসে তরুণদের সঠিক নীতি-নৈতিকতার পাঠ দেওয়া।

সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত ক্ষমতার ঢাল নয়; এটি মানুষের কথা বলার দায়িত্ব। অপসাংবাদিকতার পচন যত গভীরই হোক, সত্যকে মুছে ফেলা যায় না। সততা, দায়িত্ববোধ ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমেই সাংবাদিকতার হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনা সম্ভব।