১০:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মান্তাদের সরকারি সেবায় যুক্ত করতে বরিশালে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

নদীনির্ভর জলেভাসা মান্তা জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল দক্ষতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বরিশাল ক্লাবে ‘স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংলাপ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ইয়ুথনেট গ্লোবাল বাস্তবায়িত ‘মান্তাকানেক্ট’ প্রকল্পের আওতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

বরিশাল অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক মান্তা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি সুবিধা গ্রহণ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে আসছে। তাদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়।

সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। এতে মৎস্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেরুন নাহার মুন্নি, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক, টুঙ্গিবাড়িয়া ও চরবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, এশিয়া ফাউন্ডেশনের টিম লিডার মীর জুনায়েদ জামালসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী, মান্তা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাংবাদিকেরা অংশ নেন।

সংলাপে মান্তা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তারা জানান, দীর্ঘদিনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তারা মৌলিক সেবা থেকে পিছিয়ে রয়েছেন।

আলোচনায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা মান্তা জনগোষ্ঠীর জন্য তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন সেবা সম্পর্কে অবহিত করেন। পাশাপাশি সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, “আমরা মানুষ, আমাদের একসঙ্গে বাঁচতে হবে। আমার কাছে সব মানুষ সমান। মান্তা, হিজড়া, হিন্দু-মুসলিম—এ ধরনের কোনো ভেদাভেদ রেখে আমরা সামনে এগোতে পারব না।”

তিনি বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। আমি মান্তাদের জন্য কাজ করব। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে তারা সিটি করপোরেশনে আসতে পারবেন। আমি সবসময় তাদের পাশে আছি।”

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “মান্তা পরিচয়ের আগে তারা মানুষ। তবে দীর্ঘদিন ধরে তারা দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু কোনো প্রকল্পের বিষয় নয়, এটি তাদের মৌলিক অধিকার।”

তিনি বলেন, “মান্তাকানেক্ট প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা মান্তা জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি করছি। তবে এসব উদ্যোগ যেন শুধু প্রকল্পের সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ের নিয়মিত সেবার সঙ্গে মান্তাদের কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায় এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান শুভ বলেন, “মান্তারা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা নানা ধরনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার মধ্যে রয়েছেন। তাদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “আজকের সংলাপ সরকারি সেবার সঙ্গে মান্তাদের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।”

সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা মান্তা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।

আয়োজকেরা জানান, এই সংলাপের মাধ্যমে মান্তা জনগোষ্ঠী ও সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

মান্তাদের সরকারি সেবায় যুক্ত করতে বরিশালে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

Update Time : ০৬:২৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

নদীনির্ভর জলেভাসা মান্তা জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল দক্ষতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বরিশাল ক্লাবে ‘স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংলাপ’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এ আহ্বান জানানো হয়। এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ইয়ুথনেট গ্লোবাল বাস্তবায়িত ‘মান্তাকানেক্ট’ প্রকল্পের আওতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।

বরিশাল অঞ্চলের নদীকেন্দ্রিক মান্তা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি সুবিধা গ্রহণ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে আসছে। তাদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং সরকারি সেবার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়।

সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। এতে মৎস্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেরুন নাহার মুন্নি, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক, টুঙ্গিবাড়িয়া ও চরবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, এশিয়া ফাউন্ডেশনের টিম লিডার মীর জুনায়েদ জামালসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী, মান্তা পরিচালনা কমিটির সদস্য ও সাংবাদিকেরা অংশ নেন।

সংলাপে মান্তা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তারা জানান, দীর্ঘদিনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তারা মৌলিক সেবা থেকে পিছিয়ে রয়েছেন।

আলোচনায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা মান্তা জনগোষ্ঠীর জন্য তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন সেবা সম্পর্কে অবহিত করেন। পাশাপাশি সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, “আমরা মানুষ, আমাদের একসঙ্গে বাঁচতে হবে। আমার কাছে সব মানুষ সমান। মান্তা, হিজড়া, হিন্দু-মুসলিম—এ ধরনের কোনো ভেদাভেদ রেখে আমরা সামনে এগোতে পারব না।”

তিনি বলেন, “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য কাজ করা আমাদের দায়িত্ব। আমি মান্তাদের জন্য কাজ করব। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে তারা সিটি করপোরেশনে আসতে পারবেন। আমি সবসময় তাদের পাশে আছি।”

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “মান্তা পরিচয়ের আগে তারা মানুষ। তবে দীর্ঘদিন ধরে তারা দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা শুধু কোনো প্রকল্পের বিষয় নয়, এটি তাদের মৌলিক অধিকার।”

তিনি বলেন, “মান্তাকানেক্ট প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা মান্তা জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি করছি। তবে এসব উদ্যোগ যেন শুধু প্রকল্পের সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ের নিয়মিত সেবার সঙ্গে মান্তাদের কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায় এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

ইয়ুথনেট গ্লোবালের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান শুভ বলেন, “মান্তারা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তারা নানা ধরনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বঞ্চনার মধ্যে রয়েছেন। তাদের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “আজকের সংলাপ সরকারি সেবার সঙ্গে মান্তাদের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।”

সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা মান্তা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।

আয়োজকেরা জানান, এই সংলাপের মাধ্যমে মান্তা জনগোষ্ঠী ও সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।