
নিজস্ব প্রতিবেদক: মূল ধারার সংবাদকর্মীদের কঠোর পরিশ্রমে সংগৃহীত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হুবহু চুরি (কপি) করে, পরবর্তীতে অভিযুক্তদের ব্ল্যাকমেইল ও আর্থিক রফাদফার মাধ্যমে তা ধামাচাপা দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ময়মনসিংহ বিআরটিএ-র দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে ‘৭৫ বাংলাদেশ’ (75bangladesh.com) নামক একটি অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে এই অপসাংবাদিকতার প্রমাণ মিলেছে। মাঠপর্যায়ের সংবাদকে পুঁজি করে একশ্রেণীর নামসর্বস্ব পোর্টালের এই ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’র কারণে একদিকে যেমন প্রকৃত সাংবাদিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে পার পেয়ে যাচ্ছে মূল অপরাধীরা।
অনুসন্ধানী নিউজ ও চুরির ফাঁদ:
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুন ও ১ জুলাই ময়মনসিংহ বিআরটিএ-র পরিদর্শক বাবরের বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট নিয়ে তথ্য-প্রমাণসহ একটি বিশদ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক মামুনুর রশীদ মামুন।
প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে আসার পরপরই ‘৭৫ বাংলাদেশ’ নামক ফেসবুক পেজটি মূল প্রতিবেদকের কোনো অনুমতি ছাড়াই সংবাদটি হুবহু কপি করে নিজেদের লোগো বসিয়ে প্রচার করে। সংযুক্ত স্ক্রিনশট (1000327918.jpg)-এ দেখা যায়, “ময়মনসিংহ বিআরটিএতে বেপরোয়া পরিদর্শক বাবর, ঘুষ বাণিজ্য সিন্ডিকেটের গুরুতর অভিযোগ” শিরোনামে তারা হুবহু সেই তথ্য প্রকাশ করে ব্যাপক ভিউ ও শেয়ার হাতিয়ে নেয়।
জনস্বার্থ নাকি ব্ল্যাকমেইলিং?
অভিযোগ উঠেছে, এই চক্রটির সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্য জনসচেতনতা ছিল না; বরং এটিকে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল মূল লক্ষ্য। নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, সংবাদটি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে পর্দার আড়ালে অভিযুক্ত বিআরটিএ কর্মকর্তা বাবরের সাথে বড় অঙ্কের আর্থিক সমঝোতা করে চক্রটি। আর রফাদফা নিশ্চিত হওয়ার পরপরই রহস্যজনকভাবে পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ থেকে সুনির্দিষ্ট ওই সংবাদ ও পোস্টটি সম্পূর্ণ মুছে (ডিলিট বা হাইড) ফেলা হয়।
ক্ষুব্ধ সাংবাদিক মহল: ‘এটি সাংবাদিকতা নয়, সুচতুর প্রতারণা’:
এই ঘটনা গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনোভাবেই সাংবাদিকতা নয়, বরং সুচতুর প্রতারণা ও অপরাধ।
মেধাস্বত্ব হরণ: অন্যের কষ্টার্জিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন চুরি করা সাংবাদিকতার নীতিমালার চরম লঙ্ঘন।
পেশাদারিত্বের অবমাননা: অপরাধীর কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সংবাদ গায়েব করে দেওয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, যা পুরো গণমাধ্যম সেক্টরের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে একাধিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন,”রাজনৈতিক লেবাসধারী কিছু ভুঁইফোড় পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ প্রকৃত সাংবাদিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে। এর ফলে বিআরটিএ-র মতো বড় বড় সরকারি দপ্তরের মূল দুর্নীতিবাজরা যেমন ছাড় পেয়ে যাচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের চোখে সৎ সাংবাদিকদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
আড়ালে চলে যাচ্ছে মূল অপরাধ! এই চতুর রফাদফার ফলে ময়মনসিংহ বিআরটিএ-র পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট ঘুষ ও সিন্ডিকেটের অভিযোগটি ধামাচাপা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের দাবি, এই ধরনের ‘সংবাদ বাণিজ্যের’ সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সরকারি দপ্তরের দুর্নীতিবাজরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়: অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নীতিমালার কার্যকারিতা ও সুস্থ সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে বিশেষজ্ঞরা তিনটি জরুরি পদক্ষেপের কথা বলছেন:
১. কঠোর আইনি নজরদারি: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি-র (BTRC) উচিত অনিবন্ধিত এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ে লিপ্ত থাকা পেজ ও পোর্টালগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
২. পাঠকের সচেতনতা: সাধারণ পাঠকদের ফেসবুকের ভুঁইফোড় ক্লিকবেইট পেজ এবং মূল ধারার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের সংবাদের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে হবে।
৩. মূল দুর্নীতির তদন্ত: বাহ্যিক এই রফাদফার নাটকের বাইরে গিয়ে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের উচিত পরিদর্শক বাবরের বিরুদ্ধে ওঠা মূল দুর্নীতির অভিযোগটির সুনির্দিষ্ট বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত নিশ্চিত করা।
পর্যবেক্ষণ: সাংবাদিকতা সমাজের দর্পণ, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার হাতিয়ার নয়। গণমাধ্যমের পবিত্রতা রক্ষা করতে এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙতে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক প্রতিরোধ প্রয়োজন।
প্রতিনিধির নাম 



















