
হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজঃ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উচ্চারণ একসময় জনসভাকে উত্তাল করত, তরুণদের চোখে আগুন জ্বালাত, শাসকদের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিত। অথচ সময়ের নির্মম স্রোতে সেই নামগুলোই একদিন হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। তেমনই এক বেদনাময় নাম শামসুল হক।
একসময় যার কণ্ঠে কেঁপেছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজপথ, জীবনের শেষ অধ্যায়ে সেই মানুষটিই হয়ে উঠেছিলেন নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ এবং প্রায় পরিচয়হীন এক পথচারী। ইতিহাসের এই নির্মম পরিহাস আজও হৃদয়কে ভারী করে তোলে।
১৯১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমায় (বর্তমান জেলা) দেলদুয়ারের নিভৃত গ্রাম মাইঠানে জন্মগ্রহণ করেন শামসুল হক।
পৈতৃক বাড়ি ছিল টেউরিয়া গ্রামে। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর চোখে ছিল অসাধারণ স্বপ্ন—একটি স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন।খবর আইবিএননিউজ ।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন। জাহ্নবী হাইস্কুল থেকে ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক এবং করটিয়া সাদ’ত কলেজ থেকে ১৯৪০ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৪৩ সালে বিএ (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। আইন বিভাগে ভর্তি হলেও রাজনীতির ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবন তাঁকে আর সেই পড়াশোনা শেষ করতে দেয়নি।
তৎকালীন ভারতবর্ষের উত্তাল রাজনৈতিক সময়েই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, মুসলিম লীগবিরোধী সংগ্রাম—সবখানেই তিনি ছিলেন সক্রিয়, সাহসী ও আপসহীন।
ঢাকার ১৫০ মোগলটুলী পার্টি হাউস ছিল তাঁর রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার কেন্দ্র। সেখানে তিনি তরুণ কর্মীদের সংগঠিত করতেন। সে সময় ঢাকার নবাব পরিবার ও খাজাদের আধিপত্যের বিপরীতে তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম-এর আদর্শের অনুসারী।
রাজনীতিতে তাঁর সততা, সাহস ও সাংগঠনিক দক্ষতা খুব দ্রুত তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
সেই সময় রাজনীতি ছিল মূলত জমিদার, নবাব ও অভিজাত পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। সাধারণ পরিবারের সন্তানদের রাজনীতিতে উঠে আসা ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু শামসুল হক সেই প্রথাকে ভেঙে দিয়েছিলেন।
১৯৪৯ সালের উপনির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন করটিয়ার প্রভাবশালী জমিদার খুররম খান পন্নী-এর বিরুদ্ধে। সবাই ভেবেছিল এটি অসম লড়াই। কিন্তু ফলাফল পুরো পূর্ব পাকিস্তানকে বিস্মিত করে দেয়।
শামসুল হক বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।
এই বিজয় শুধু একজন প্রার্থীর জয় ছিল না—এটি ছিল সাধারণ মানুষের জাগরণের প্রতীক। মানুষ বুঝতে শুরু করল, রাজনীতি কেবল অভিজাতদের সম্পত্তি নয়।
আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। দলের সাংগঠনিক ভিত গড়ে তুলতে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য।
তাঁর পাশে তখন ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি ছিলেন সম্মুখসারির সৈনিক।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ডাকা ধর্মঘটে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সেদিন পুলিশি দমন-পীড়নে গ্রেফতার হন শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদসহ অনেকে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রসমাবেশে তিনি উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন—আবেগ নয়, আন্দোলনকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু উত্তাল তরুণ সমাজ সেদিন আর থামেনি। ইতিহাস নিজের গতিতে এগিয়ে যায়।
পরে সরকার তাঁকে জননিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে।
কারাগারের অন্ধকার ও এক মহান নেতার ভাঙন।
কারাগারে তাঁর ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। দীর্ঘ বন্দিজীবন, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার ধীরে ধীরে ভেঙে দেয় এক দুর্দমনীয় মানুষকে।
মস্তিষ্কে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসার জন্য তাঁকে করাচির মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু আর সুস্থ হয়ে ওঠেননি তিনি।
একসময় যিনি হাজারো তরুণের প্রেরণা ছিলেন, তিনি পরিণত হলেন অসহায় এক নিঃসঙ্গ মানুষে।
রাজনীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতা তখন তাঁকে ভুলতে শুরু করেছে।
ভালোবাসার মানুষ আফিয়া খাতুনকে বিয়ে করেছিলেন শামসুল হক। তাঁদের দুটি কন্যাসন্তানও ছিল। কিন্তু অসুস্থতার পর সংসারও ভেঙে যায়।
মানসিক বিপর্যয়ের কারণে নিজের পরিবার সম্পর্কেও তাঁর মনে সন্দেহ জন্ম নেয়। স্ত্রী একসময় তাঁকে ছেড়ে চলে যান বিদেশে।
যে মানুষটি জাতির জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের ঘরও ধরে রাখতে পারেননি।
১৯৬২ সালে তাঁর মৃত্যুর গুজব ছাপা হয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাকে। টাঙ্গাইল ও ঢাকায় শোকসভাও হয়েছিল। পরে জানা গেল তিনি তখনও জীবিত।
কিন্তু জীবিত থেকেও যেন তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন মানুষের স্মৃতি থেকে।
১৯৬৪ সালে তিনি নিখোঁজ হন।
পরে জানা যায়, ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সিরাজগঞ্জের পথে ভয়াবহ অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাঁকে খুঁজে পান কংগ্রেস নেতা মহিউদ্দিন আনসারী। তিনি শামসুল হককে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন।
সাত দিন জ্বরে ভোগার পর ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইহধাম ত্যাগ করেন বাংলার এই বিস্মৃত নেতা।
না ছিল রাষ্ট্রীয় সম্মান,
না ছিল রাজনৈতিক শোকসভা,
না ছিল হাজার মানুষের জনসমুদ্র।
একটি ছোট্ট গ্রামের মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কদিমহামজানি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
শামসুল হকের জীবন একদিকে যেমন সংগ্রাম, আদর্শ ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে তেমনি এটি আমাদের রাজনৈতিক সমাজের নির্মম বিস্মৃতির দলিল।
যে মানুষটি একদিন বাংলার তরুণ সমাজের হৃদস্পন্দন ছিলেন, যাঁর ভাষণে কেঁপেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী, জীবনের শেষে তিনিই হয়ে গেলেন এক অবহেলিত নাম।ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর।
সে কখনও কখনও তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরও ভুলে যায়।
কিন্তু সত্যিকারের ইতিহাস কখনও মুছে যায় না।
শামসুল হকের মতো মানুষরা বেঁচে থাকেন সংগ্রামের প্রেরণায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসে, এবং বাংলার মুক্তচিন্তার ইতিহাসে এক অমলিন আলোকবর্তিকা হয়ে।
প্রতিনিধির নাম 



















