১১:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কোরবানির প্রকৃত মর্মকথার অমিও বাণী আত্মত্যাগ বনাম আধুনিকতার আড়ম্বর

বিশেষ প্রতিনিধি- জাহারুল ইসলাম জীবন এর লেখা ও সম্পাদনায়- ২য় পর্ব।
আধ্যাত্মিকতার দর্পণে নফ্সের কোরবানি ও সমসাময়িক খতিয়ান- প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি কোরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট্ এবং কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক জাহারুল ইসলাম জীবনের গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে কীভাবে মানুষের ভেতরের ষড়রিপু বা পাশবিকতাকে দমন করাই কোরবানির মূল উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় পর্বে আমরা এর আরও গভীরে প্রবেশ করব-যেখানে কোরআন ও হাদিসের অকাট্য প্রমাণের আলোতে আত্মশুদ্ধির নিগূঢ়তম তত্ত্ব এবং বর্তমান ঘুণে ধরা সমাজের এক নির্মম বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।
➤১. কোরবানির নিগূঢ়তম তাত্ত্বিক তত্ত্বে রক্ত-মাংস বনাম তাকওয়া:- ইসলামী শরিয়ত ও আধ্যাত্মিকতার (তাসাউফ) মূল কথা হলো, আল্লাহ তায়ালা বান্দার বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে তার অন্তরের নিয়ত ও পবিত্রতাকে প্রাধান্য দেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এর মূল সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
**☞”আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (পরহেযগারী)।”- (সূরা আল-হাজ্ব, আয়াত: ৩৭)
গবেষক জাহারুল ইসলাম জীবনের সেই কালজয়ী তত্ত্ব-“ছয় লতিফা বা ষড়রিপুকে ছয় বছরে ছয়টি পশুর ওপর ভর করে কোরবানি দেওয়া”- এই আয়াতের সাথে হুবহু মিলে যায়। পশুর গলায় যখন ছুরি চলে, তখন মূলত মানুষের ভেতরের ‘নফ্সে আম্মারা’ বা কুপ্রবৃত্তির গলায় ছুরি চালানোই আধ্যাত্মিক কোরবানির মূল হাকিকত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
**☞”নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের শরীর এবং তোমাদের অবয়বের দিকে তাকান না, বরং তিনি তাকান তোমাদের অন্তরের দিকে।”- (সহীহ মুসলিম)
সুতরাং, যে ব্যক্তি তার ভেতরের হিংসা, অহংকার ও রিয়া (লোক দেখানো মনোভাব) কোরবানি করতে পারল না, তার কোরবানি কেবলই একটি পশুর প্রাণহীন রক্তপাতে রূপ নেয়।
➤২. সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার খতিয়ানে ‘লাইভ’ বনাম লৌকিকতা:- বর্তমান আধুনিক যুগে কোরবানি যেন এক সামাজিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ। সমসাময়িক সমাজে আমরা কী দেখছি?
** হাটে পশু কেনায় অহমিকা:- কে কত লক্ষ টাকা দিয়ে হাটের সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে আলোচিত পশুটি কিনল, তা নিয়ে চলে তুমুল প্রতিযোগিতা
** ডিজিটাল রিয়া (লোক দেখানো সংস্কৃতি):- পশু কেনার পর থেকে শুরু করে জবাইয়ের মুহূর্ত পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘লাইভ’ ও সেলফির হিড়িক পড়ে। “আমার পশুর দাম এত লাখ”- এই অহংকারী প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় ইব্রাহিমী সুন্নতের সেই নীরব, নিভৃত আত্মত্যাগ।
** মাংসের হিসাব ও ফ্রিজ সংস্কৃতি:- কোরবানির উদ্দেশ্য যেখানে গরিব-দুঃখীর মুখে হাঁসি ফোঁটানো, সেখানে আধুনিক সমাজের একটি বড় অংশ ব্যস্ত থাকে কীভাবে রেফ্রিজারেটরের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী মাংসের বড় অংশটি নিজের জন্য জমা রাখা যায়।
জাহারুল ইসলাম জীবন তাঁর গভীর দূরদর্শিতা দিয়ে এই সমাজকে অবলোকন করে সঠিকভাবেই বলেছেন যে, টাকার গরমে কিংবা হারাম উপার্জনে যারা পশুর পেছনে লাখ লাখ টাকা ঢালছেন, তাদের সেই দেখনদারি কোরবানি আল্লাহর দরবারে শুধুই নিষ্ফল।
➤৩. আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত শিখরে “জিন্দা থেকেই মৃত্যু সাধনা:”- হাকিকতের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘মউতু ক্ববলাল মউত’ বা মৃত্যুর আগেই মৃত্যু বরণ করা। জাহারুল ইসলাম জীবনের বিশ্লেষণে যে সপ্তম কোরবানির কথা বলা হয়েছে- অর্থাৎ নিজের সত্ত্বাকে আল্লাহর রাহে সঁপে দেওয়া-তা হলো আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তর।
যখন একজন মুমিন তার সমস্ত অহমিকা, অর্থলিপ্সা এবং জাগতিক মোহের মৃত্যু ঘটিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ করে আল্লাহর চরণে সঁপে দেয়, তখনই সে প্রকৃত ‘ইনসানে কামেল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়।
**☞পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:-“বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।”- (সূরা আল-আন’আম, আয়াত: ১৬২)
**☞এই আয়াতটিই প্রমাণ করে যে, প্রকৃত কোরবানিদাতার জীবন ও মরণ কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিমণ্ডলে আবর্তিত হয়। সেখানে লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদার কোনো স্থান নেই।➤পরিশেষে আত্মশুদ্ধির মহোত্তম আহ্বান বলতে চাই:- কোরবানি কোনো বার্ষিক উৎসবের নাম নয়, এটি এক পরম আত্মশুদ্ধির পাঠশালা। সমসাময়িক যুগের আধুনিকতার আড়ম্বর, কোটি টাকার পশুর প্রদর্শনী আর সামাজিক স্ট্যাটাসের মোহ থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে।
**☞➤গবেষক ও লেখক জাহারুল ইসলাম জীবনের এই তাত্ত্বিক লেখনী আমাদের চোখ খুলে দেয়। আমাদের উচিত বনের পশুর আগে মনের পশুকে চেনা এবং প্রতি বছর একটি একটি করে নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তিকে চিরতরে বিদায় দেওয়া। হালাল উপার্জনে, বিনম্র চিত্তে, কেবলই আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে যখন আমরা পশুর ওপর ছুরি চালাব, তখন-ই কেবল কোরবানির প্রকৃত নূর আমাদের আত্মা ও সমাজকে আলোকিত করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরবানির এই প্রকৃত হাকিকত বোঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুন <🤲> আমীন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

কোরবানির প্রকৃত মর্মকথার অমিও বাণী আত্মত্যাগ বনাম আধুনিকতার আড়ম্বর

Update Time : ১২:১৩:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি- জাহারুল ইসলাম জীবন এর লেখা ও সম্পাদনায়- ২য় পর্ব।
আধ্যাত্মিকতার দর্পণে নফ্সের কোরবানি ও সমসাময়িক খতিয়ান- প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি কোরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট্ এবং কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক জাহারুল ইসলাম জীবনের গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে কীভাবে মানুষের ভেতরের ষড়রিপু বা পাশবিকতাকে দমন করাই কোরবানির মূল উদ্দেশ্য। দ্বিতীয় পর্বে আমরা এর আরও গভীরে প্রবেশ করব-যেখানে কোরআন ও হাদিসের অকাট্য প্রমাণের আলোতে আত্মশুদ্ধির নিগূঢ়তম তত্ত্ব এবং বর্তমান ঘুণে ধরা সমাজের এক নির্মম বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।
➤১. কোরবানির নিগূঢ়তম তাত্ত্বিক তত্ত্বে রক্ত-মাংস বনাম তাকওয়া:- ইসলামী শরিয়ত ও আধ্যাত্মিকতার (তাসাউফ) মূল কথা হলো, আল্লাহ তায়ালা বান্দার বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে তার অন্তরের নিয়ত ও পবিত্রতাকে প্রাধান্য দেন। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ এর মূল সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:
**☞”আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (পরহেযগারী)।”- (সূরা আল-হাজ্ব, আয়াত: ৩৭)
গবেষক জাহারুল ইসলাম জীবনের সেই কালজয়ী তত্ত্ব-“ছয় লতিফা বা ষড়রিপুকে ছয় বছরে ছয়টি পশুর ওপর ভর করে কোরবানি দেওয়া”- এই আয়াতের সাথে হুবহু মিলে যায়। পশুর গলায় যখন ছুরি চলে, তখন মূলত মানুষের ভেতরের ‘নফ্সে আম্মারা’ বা কুপ্রবৃত্তির গলায় ছুরি চালানোই আধ্যাত্মিক কোরবানির মূল হাকিকত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
**☞”নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের শরীর এবং তোমাদের অবয়বের দিকে তাকান না, বরং তিনি তাকান তোমাদের অন্তরের দিকে।”- (সহীহ মুসলিম)
সুতরাং, যে ব্যক্তি তার ভেতরের হিংসা, অহংকার ও রিয়া (লোক দেখানো মনোভাব) কোরবানি করতে পারল না, তার কোরবানি কেবলই একটি পশুর প্রাণহীন রক্তপাতে রূপ নেয়।
➤২. সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার খতিয়ানে ‘লাইভ’ বনাম লৌকিকতা:- বর্তমান আধুনিক যুগে কোরবানি যেন এক সামাজিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ। সমসাময়িক সমাজে আমরা কী দেখছি?
** হাটে পশু কেনায় অহমিকা:- কে কত লক্ষ টাকা দিয়ে হাটের সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে আলোচিত পশুটি কিনল, তা নিয়ে চলে তুমুল প্রতিযোগিতা
** ডিজিটাল রিয়া (লোক দেখানো সংস্কৃতি):- পশু কেনার পর থেকে শুরু করে জবাইয়ের মুহূর্ত পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘লাইভ’ ও সেলফির হিড়িক পড়ে। “আমার পশুর দাম এত লাখ”- এই অহংকারী প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় ইব্রাহিমী সুন্নতের সেই নীরব, নিভৃত আত্মত্যাগ।
** মাংসের হিসাব ও ফ্রিজ সংস্কৃতি:- কোরবানির উদ্দেশ্য যেখানে গরিব-দুঃখীর মুখে হাঁসি ফোঁটানো, সেখানে আধুনিক সমাজের একটি বড় অংশ ব্যস্ত থাকে কীভাবে রেফ্রিজারেটরের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী মাংসের বড় অংশটি নিজের জন্য জমা রাখা যায়।
জাহারুল ইসলাম জীবন তাঁর গভীর দূরদর্শিতা দিয়ে এই সমাজকে অবলোকন করে সঠিকভাবেই বলেছেন যে, টাকার গরমে কিংবা হারাম উপার্জনে যারা পশুর পেছনে লাখ লাখ টাকা ঢালছেন, তাদের সেই দেখনদারি কোরবানি আল্লাহর দরবারে শুধুই নিষ্ফল।
➤৩. আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত শিখরে “জিন্দা থেকেই মৃত্যু সাধনা:”- হাকিকতের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘মউতু ক্ববলাল মউত’ বা মৃত্যুর আগেই মৃত্যু বরণ করা। জাহারুল ইসলাম জীবনের বিশ্লেষণে যে সপ্তম কোরবানির কথা বলা হয়েছে- অর্থাৎ নিজের সত্ত্বাকে আল্লাহর রাহে সঁপে দেওয়া-তা হলো আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ স্তর।
যখন একজন মুমিন তার সমস্ত অহমিকা, অর্থলিপ্সা এবং জাগতিক মোহের মৃত্যু ঘটিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ করে আল্লাহর চরণে সঁপে দেয়, তখনই সে প্রকৃত ‘ইনসানে কামেল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়।
**☞পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:-“বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।”- (সূরা আল-আন’আম, আয়াত: ১৬২)
**☞এই আয়াতটিই প্রমাণ করে যে, প্রকৃত কোরবানিদাতার জীবন ও মরণ কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিমণ্ডলে আবর্তিত হয়। সেখানে লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদার কোনো স্থান নেই।➤পরিশেষে আত্মশুদ্ধির মহোত্তম আহ্বান বলতে চাই:- কোরবানি কোনো বার্ষিক উৎসবের নাম নয়, এটি এক পরম আত্মশুদ্ধির পাঠশালা। সমসাময়িক যুগের আধুনিকতার আড়ম্বর, কোটি টাকার পশুর প্রদর্শনী আর সামাজিক স্ট্যাটাসের মোহ থেকে আমাদের ফিরে আসতে হবে।
**☞➤গবেষক ও লেখক জাহারুল ইসলাম জীবনের এই তাত্ত্বিক লেখনী আমাদের চোখ খুলে দেয়। আমাদের উচিত বনের পশুর আগে মনের পশুকে চেনা এবং প্রতি বছর একটি একটি করে নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তিকে চিরতরে বিদায় দেওয়া। হালাল উপার্জনে, বিনম্র চিত্তে, কেবলই আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে যখন আমরা পশুর ওপর ছুরি চালাব, তখন-ই কেবল কোরবানির প্রকৃত নূর আমাদের আত্মা ও সমাজকে আলোকিত করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরবানির এই প্রকৃত হাকিকত বোঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুন <🤲> আমীন।