১০:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামের বায়েজীদে দেয়াল ধসে শিশুমৃত্যু: অবৈধ পলিথিন কারখানা ঘিরে ক্ষোভ ও আতঙ্ক

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরফিন নগর মুক্তিযোদ্ধা কলোনী রোডে অবস্থিত একটি নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানার দেয়াল ধসে সাত বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু ও আরেক শিশুর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। শনিবার (২৩ মে) বিকেল ৫টার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় স্থানীয়রা অবৈধ কারখানার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিকেলে রাস্তায় খেলাধুলা করছিল কয়েকজন শিশু। এসময় হঠাৎ বিকট শব্দে কারখানার একটি বড় দেয়াল ধসে পড়ে। দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই এক শিশুর মৃত্যু হয় এবং গুরুতর আহত হয় আরেক শিশু। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক একজনকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত শিশুটি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ধসে পড়া দেয়ালের ইট-পাথর ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। নিহত শিশুর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অবৈধভাবে নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানা পরিচালিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কারখানাটি বছরের পর বছর চালিয়ে আসা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারখানাটির সঙ্গে রমজান আলী নামের এক ব্যক্তি জড়িত থাকলেও এলাকাবাসীর দাবি, এর পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেলাল নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন এবং কারখানাটির মূল নিয়ন্ত্রক তিনিই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বেলাল বলেন, “এই ফ্যাক্টরি আমার না, এটা বিএনপির সাবেক এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের।”
অন্যদিকে কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি শুধু ফ্যাক্টরিটা ভাড়া নিয়েছি।” পরে তিনি দাবি করেন, “ফ্যাক্টরির আসল মালিক একজন পুলিশ।” এরপরই তিনি ফোন কেটে দেন।
এ ঘটনায় এলাকায় নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি প্রশাসনের প্রভাবশালী কেউ জড়িত না থাকেন, তাহলে আবাসিক এলাকায় এতদিন কীভাবে অবৈধ কারখানাটি নির্বিঘ্নে চলল?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে দীর্ঘদিন ধরে জুয়া, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলে। মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। আজ একটা শিশু মারা গেছে, কিন্তু এর দায় কেউ নেবে না।”
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “দেয়াল ধসে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আরেকজন আহত হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
পরিবেশবাদীদের মতে, আবাসিক এলাকায় নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানা পরিচালনা শুধু বেআইনি নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান না থাকায় এ ধরনের কারখানা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্তার লাভ করছে।
ঘটনার পর স্থানীয়রা অবিলম্বে কারখানাটি সিলগালা, দায়ীদের গ্রেফতার, অবৈধ সম্পদের তদন্ত এবং এলাকায় সন্ত্রাস ও দখলবাজির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিহত শিশুর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহত শিশুর উন্নত চিকিৎসারও দাবি তোলা হয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

চট্টগ্রামের বায়েজীদে দেয়াল ধসে শিশুমৃত্যু: অবৈধ পলিথিন কারখানা ঘিরে ক্ষোভ ও আতঙ্ক

Update Time : ০৫:৫৬:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার আরফিন নগর মুক্তিযোদ্ধা কলোনী রোডে অবস্থিত একটি নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানার দেয়াল ধসে সাত বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু ও আরেক শিশুর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। শনিবার (২৩ মে) বিকেল ৫টার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় স্থানীয়রা অবৈধ কারখানার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিকেলে রাস্তায় খেলাধুলা করছিল কয়েকজন শিশু। এসময় হঠাৎ বিকট শব্দে কারখানার একটি বড় দেয়াল ধসে পড়ে। দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই এক শিশুর মৃত্যু হয় এবং গুরুতর আহত হয় আরেক শিশু। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক একজনকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত শিশুটি আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ধসে পড়া দেয়ালের ইট-পাথর ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। নিহত শিশুর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অবৈধভাবে নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানা পরিচালিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কারখানাটি বছরের পর বছর চালিয়ে আসা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারখানাটির সঙ্গে রমজান আলী নামের এক ব্যক্তি জড়িত থাকলেও এলাকাবাসীর দাবি, এর পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেলাল নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন এবং কারখানাটির মূল নিয়ন্ত্রক তিনিই।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বেলাল বলেন, “এই ফ্যাক্টরি আমার না, এটা বিএনপির সাবেক এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের।”
অন্যদিকে কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি শুধু ফ্যাক্টরিটা ভাড়া নিয়েছি।” পরে তিনি দাবি করেন, “ফ্যাক্টরির আসল মালিক একজন পুলিশ।” এরপরই তিনি ফোন কেটে দেন।
এ ঘটনায় এলাকায় নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি প্রশাসনের প্রভাবশালী কেউ জড়িত না থাকেন, তাহলে আবাসিক এলাকায় এতদিন কীভাবে অবৈধ কারখানাটি নির্বিঘ্নে চলল?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, “এখানে দীর্ঘদিন ধরে জুয়া, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলে। মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারে না। আজ একটা শিশু মারা গেছে, কিন্তু এর দায় কেউ নেবে না।”
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “দেয়াল ধসে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আরেকজন আহত হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
পরিবেশবাদীদের মতে, আবাসিক এলাকায় নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানা পরিচালনা শুধু বেআইনি নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান না থাকায় এ ধরনের কারখানা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্তার লাভ করছে।
ঘটনার পর স্থানীয়রা অবিলম্বে কারখানাটি সিলগালা, দায়ীদের গ্রেফতার, অবৈধ সম্পদের তদন্ত এবং এলাকায় সন্ত্রাস ও দখলবাজির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি নিহত শিশুর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহত শিশুর উন্নত চিকিৎসারও দাবি তোলা হয়েছে।