০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে ডিএনসিকে ঘিরে ‘মাসোয়ারা সিন্ডিকেট’ অভিযোগে জনমনে তীব্র ক্ষোভ

মামুনুর রশীদ মামুন | ময়মনসিংহ:
রাষ্ট্রের “জিরো টলারেন্স” নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগকারী সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। কিন্তু ময়মনসিংহে সেই সংস্থাকেই ঘিরে উঠছে ভয়াবহ দুর্নীতি, মাসোয়ারা বাণিজ্য, মাদক গডফাদারদের সুরক্ষা, প্রশাসনিক অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, “মাদক দমন নয়—বরং মাদক ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করার অদৃশ্য সিন্ডিকেটে” পরিণত হয়েছে ডিএনসির একটি অংশ। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ময়মনসিংহ শহর থেকে শুরু করে ত্রিশাল, নান্দাইল, গৌরীপুর, ফুলবাড়িয়া, হালুয়াঘাট, তারাকান্দা, ভালুকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, সাপ্তাহিক ও মাসিক নির্ধারিত “মাসোয়ারা” আদায়ের মাধ্যমে একাধিক মাদক স্পটকে দেওয়া হয়েছে অলিখিত “সেফ জোন”।
অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ডিএনসির সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনি, উপপরিচালক (ডিডি) আনোয়ার হোসেন,কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং হিসাবরক্ষক এম এ কবিরের নাম। যদিও অভিযুক্তরা অধিকাংশ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অথবা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি।
ভয়েস রেকর্ডে ‘মাসোয়ারা’ স্বীকারের অভিযোগ: ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর ফাঁস হওয়া একটি ভয়েস রেকর্ড নতুন করে নাড়িয়ে দেয় পুরো জেলাকে। অডিওটিতে ডিএনসির এএসআই আমেনা বেগমকে কথিত এক মদ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে মাসোয়ারা,মামলা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলার অভিযোগ ওঠে। ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায় বলে অভিযোগ—
“আমাদেরটা আমাদের দিবি, আগে যা দিছস এবারও তাই দিবি। না হলে মামলা হইব।” স্থানীয়দের মতে,এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়; বরং পুরো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত নেটওয়ার্কের আভাস বহন করে। অডিও ফাঁসের পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ‘রনির ডিজি অফিসে অদৃশ্য শক্তি’—জনমনে নতুন প্রশ্ন: ফাঁস হওয়া কথোপকথনে আরও উঠে আসে সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনির নাম। অভিযোগ অনুযায়ী,এএসআই আমেনা বেগম কথোপকথনে আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন—রনির “ডিজি অফিসে শক্তিশালী যোগাযোগ” রয়েছে এবং তিনি চাইলে যেকোনো কর্মকর্তাকে বদলি করাতে পারেন।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ডিএনসির ভেতরে একটি “অদৃশ্য ক্ষমতা কেন্দ্র” বা সিন্ডিকেটের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—কীভাবে একই জেলার কয়েকজন কর্মকর্তা বছরের পর বছর নিজেদের এলাকায় থেকে প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেন? কেন এত অভিযোগের পরও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? ডিজি অফিস পর্যন্ত কারা এই প্রভাবের পেছনে রয়েছে?
স্থানীয়দের অভিযোগ,এই প্রভাববলয়ের কারণেই বহু অভিযোগ চাপা পড়ে গেছে। ‘মাসোয়ারা’ দিয়ে চলছে মাদক স্পট: অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগে উঠে এসেছে একাধিক মাদক স্পট ও নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক।
অভিযোগ অনুযায়ী—নগরীর ব্রীজ মোড় এলাকার “সুরমা স্পট” থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮ হাজার টাকা,
“হামে স্পট” থেকে প্রায় ৬ হাজার টাকা,ভৈরব রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় সুবর্ণা নিয়ন্ত্রিত স্পট থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা,জহিরুল নামের এক গাঁজা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা,ফুলবাড়িয়ার কথিত ব্যবসায়ী জীবন বাবুর কাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা,হালুয়াঘাটের ধারা বাজারের এক মদ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা,গৌরীপুর ও ভালুকা সংলগ্ন মদপল্লী থেকে মাসিক বড় অঙ্কের অর্থ,ত্রিশালের ধলা বাজারের মদপল্লী থেকে মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তালিকাভুক্ত এসব স্পটের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান খুব কমই দেখা গেছে।‘মাদক গডফাদারদের সুরক্ষা’ অভিযোগ:
ময়না-বুচি,নজরুল-নাজু, ডালিয়া, রুমা, রুজি, স্মৃতি, কুদু, হামে, রেহেনা, দুখিনী, সুরমা, সুবর্ণা-দেলু, মোখলেস, আনু, হাফিজুল, মোফাজ্জল, আহাদ ও কাইয়ুমসহ একাধিক ব্যক্তির নাম স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে “গডফাদার” হিসেবে।
সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য—
“ছোটখাটো বাহক ধরা পড়ে,কিন্তু বড় কারবারিরা অদৃশ্য সুরক্ষা পায়। অভিযান হয় লোকদেখানো, আর ভেতরে ভেতরে চলে সমঝোতা।”
বর্তমানে অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে,অভিযোগ অনুযায়ী মাসোয়ারা আদায়ের কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন এসআই আজগর, এএসআই মাহাবুব ও এএসআই মাইন উদ্দিন। স্থানীয় সূত্র ও একাধিক অভিযোগকারীর দাবি, বিভিন্ন মাদক স্পট, দেশি মদের আড্ডা ও কথিত গডফাদারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা, “ম্যানেজমেন্ট” এবং মাসিক বা সাপ্তাহিক আর্থিক লেনদেন সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই তিন কর্মকর্তার নাম বারবার সামনে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত মাসোয়ারা পৌঁছালে সংশ্লিষ্ট স্পটগুলোতে অভিযান শিথিল থাকে; আর অর্থ লেনদেনে ব্যত্যয় ঘটলেই শুরু হয় অভিযান, মামলা কিংবা হয়রানির চাপ। যদিও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার বেশি,মামলায় কম—জব্দ আলামত কোথায় যায়? ডিএনসির কিছু অভিযানে জব্দ তালিকা ও মামলার তথ্যে অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি—
উদ্ধার ২০ কেজি গাঁজা দেখানো হলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে ১৮ কেজি,২ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মামলায় সংখ্যা কম দেখানো হয়েছে,নগদ অর্থ জব্দের ক্ষেত্রেও অমিল রয়েছে। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—জব্দ হওয়া বাকি আলামত কোথায় যায়? সংশ্লিষ্টরা কি আলামতের অংশ গোপন করছেন? নাকি জব্দ তালিকাতেই রয়েছে কারসাজি? ডিডি আনোয়ার হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন:
ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধেও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর সময়েই জেলার বিভিন্ন বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বেড বৃদ্ধি, অনুমোদন ও লাইসেন্স নবায়নে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে—পর্যাপ্ত অবকাঠামো ছাড়াই বেড সংখ্যা বৃদ্ধি,
চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের ঘাটতি,অগ্নিনিরাপত্তা না থাকা,
পৃথক কাউন্সেলিং রুম ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক সূত্রের দাবি, ফায়ার সার্ভিসের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কিছু কেন্দ্র অনুমোদন পেয়েছে। ‘মাসোয়ারা না দিলে হয়রানি’ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—দেশি মদ ব্যবসা কিংবা লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা না দিলে অভিযান, মামলা বা হয়রানির শিকার হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে—
ফুলপুরে “লাল সাধু” নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে গাঁজার মামলায় জড়ানো হয়েছে,নান্দাইলে তল্লাশির নামে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে,গৌরীপুরে আলামত ছাড়াই পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত। হিসাবরক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ: ডিএনসি ময়মনসিংহ কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। প্রায় পাঁচ বছরের বেশি সময় একই পদে থেকে তিনি বদলি ঠেকাতে প্রভাব ও অর্থ ব্যবহার করেছেন—এমন অভিযোগ করছেন সহকর্মীরা। অভিযোগ অনুযায়ী—
অফিস সামগ্রী ক্রয়ে ভুয়া বিল-ভাউচার,স্টেশনারি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো,টিএ বিল ছাড়ে ২০ শতাংশ কমিশন দাবি,সরকারি চালান কোড গোপন রেখে দেশি মদের লাইসেন্সধারীদের কাছ থেকে প্রতি চালানে ৫০০-৬০০ টাকা ঘুষ আদায়,
বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ,কাগজ-কলম ক্রয়ের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, গফরগাঁও ও নাসিরাবাদের দেশি মদের দোকানগুলোর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি এক বৈঠকে নাসিরাবাদের এক লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীর কাছে নিয়মিত অর্থ প্রদানের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য—
“কমিশন না দিলে ফাইল নড়ে না।”
তবে এম এ কবির সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
হঠাৎ সম্পদবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন:মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি—শহরে জমি,
গ্রামে বহুতল ভবন,একাধিক সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য ঘুরছে জনমুখে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—
“সরকারি বেতনে এত সম্পদ কীভাবে সম্ভব?” জনআস্থার ভয়াবহ সংকট:
মানবাধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ভেতরেই যদি দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, তাহলে পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে তরুণ সমাজের ওপর। স্থানীয়দের ভাষ্য—
“মাদক এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি সামাজিক মহামারিতে পরিণত হচ্ছে। পরিবার ভাঙছে, বাড়ছে ছিনতাই, সহিংসতা ও কিশোর অপরাধ।”
উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দাবি:সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ দাবি করেছেন—
১. এএসআই আমেনার ফাঁস হওয়া ভয়েস রেকর্ডের ফরেনসিক পরীক্ষা।
২. সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনির দায়ের করা। মামলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা
৩. উদ্ধার ও জব্দ তালিকার স্বাধীন অডিট।
৪. ডিডি আনোয়ার হোসেন, এম এ কবিরসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পদ অনুসন্ধান।
৫. মাদক নিরাময় কেন্দ্র অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত।
৬.মাসোয়ারা বাণিজ্যের অভিযোগে অভিযুক্ত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ।
৭. অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ।
বক্তব্য মেলেনি: প্রতিবেদন প্রকাশের আগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য নিতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অধিকাংশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অভিযোগ গুলো এতটাই গুরুতর যে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে—“মাদকবিরোধী অবস্থানকে বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে শুধু বাহক নয়,প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ‘জিরো টলারেন্স’ কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

ময়মনসিংহে ডিএনসিকে ঘিরে ‘মাসোয়ারা সিন্ডিকেট’ অভিযোগে জনমনে তীব্র ক্ষোভ

Update Time : ০৪:২১:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

মামুনুর রশীদ মামুন | ময়মনসিংহ:
রাষ্ট্রের “জিরো টলারেন্স” নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগকারী সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। কিন্তু ময়মনসিংহে সেই সংস্থাকেই ঘিরে উঠছে ভয়াবহ দুর্নীতি, মাসোয়ারা বাণিজ্য, মাদক গডফাদারদের সুরক্ষা, প্রশাসনিক অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, “মাদক দমন নয়—বরং মাদক ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করার অদৃশ্য সিন্ডিকেটে” পরিণত হয়েছে ডিএনসির একটি অংশ। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ময়মনসিংহ শহর থেকে শুরু করে ত্রিশাল, নান্দাইল, গৌরীপুর, ফুলবাড়িয়া, হালুয়াঘাট, তারাকান্দা, ভালুকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, সাপ্তাহিক ও মাসিক নির্ধারিত “মাসোয়ারা” আদায়ের মাধ্যমে একাধিক মাদক স্পটকে দেওয়া হয়েছে অলিখিত “সেফ জোন”।
অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে ডিএনসির সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনি, উপপরিচালক (ডিডি) আনোয়ার হোসেন,কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং হিসাবরক্ষক এম এ কবিরের নাম। যদিও অভিযুক্তরা অধিকাংশ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অথবা এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি।
ভয়েস রেকর্ডে ‘মাসোয়ারা’ স্বীকারের অভিযোগ: ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর ফাঁস হওয়া একটি ভয়েস রেকর্ড নতুন করে নাড়িয়ে দেয় পুরো জেলাকে। অডিওটিতে ডিএনসির এএসআই আমেনা বেগমকে কথিত এক মদ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে মাসোয়ারা,মামলা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলার অভিযোগ ওঠে। ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায় বলে অভিযোগ—
“আমাদেরটা আমাদের দিবি, আগে যা দিছস এবারও তাই দিবি। না হলে মামলা হইব।” স্থানীয়দের মতে,এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়; বরং পুরো একটি দুর্নীতিগ্রস্ত নেটওয়ার্কের আভাস বহন করে। অডিও ফাঁসের পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ‘রনির ডিজি অফিসে অদৃশ্য শক্তি’—জনমনে নতুন প্রশ্ন: ফাঁস হওয়া কথোপকথনে আরও উঠে আসে সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনির নাম। অভিযোগ অনুযায়ী,এএসআই আমেনা বেগম কথোপকথনে আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন—রনির “ডিজি অফিসে শক্তিশালী যোগাযোগ” রয়েছে এবং তিনি চাইলে যেকোনো কর্মকর্তাকে বদলি করাতে পারেন।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ডিএনসির ভেতরে একটি “অদৃশ্য ক্ষমতা কেন্দ্র” বা সিন্ডিকেটের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—কীভাবে একই জেলার কয়েকজন কর্মকর্তা বছরের পর বছর নিজেদের এলাকায় থেকে প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেন? কেন এত অভিযোগের পরও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? ডিজি অফিস পর্যন্ত কারা এই প্রভাবের পেছনে রয়েছে?
স্থানীয়দের অভিযোগ,এই প্রভাববলয়ের কারণেই বহু অভিযোগ চাপা পড়ে গেছে। ‘মাসোয়ারা’ দিয়ে চলছে মাদক স্পট: অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগে উঠে এসেছে একাধিক মাদক স্পট ও নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক।
অভিযোগ অনুযায়ী—নগরীর ব্রীজ মোড় এলাকার “সুরমা স্পট” থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮ হাজার টাকা,
“হামে স্পট” থেকে প্রায় ৬ হাজার টাকা,ভৈরব রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় সুবর্ণা নিয়ন্ত্রিত স্পট থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা,জহিরুল নামের এক গাঁজা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সপ্তাহে ৫ হাজার টাকা,ফুলবাড়িয়ার কথিত ব্যবসায়ী জীবন বাবুর কাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা,হালুয়াঘাটের ধারা বাজারের এক মদ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা,গৌরীপুর ও ভালুকা সংলগ্ন মদপল্লী থেকে মাসিক বড় অঙ্কের অর্থ,ত্রিশালের ধলা বাজারের মদপল্লী থেকে মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তালিকাভুক্ত এসব স্পটের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে সক্রিয় থাকলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান খুব কমই দেখা গেছে।‘মাদক গডফাদারদের সুরক্ষা’ অভিযোগ:
ময়না-বুচি,নজরুল-নাজু, ডালিয়া, রুমা, রুজি, স্মৃতি, কুদু, হামে, রেহেনা, দুখিনী, সুরমা, সুবর্ণা-দেলু, মোখলেস, আনু, হাফিজুল, মোফাজ্জল, আহাদ ও কাইয়ুমসহ একাধিক ব্যক্তির নাম স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে “গডফাদার” হিসেবে।
সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য—
“ছোটখাটো বাহক ধরা পড়ে,কিন্তু বড় কারবারিরা অদৃশ্য সুরক্ষা পায়। অভিযান হয় লোকদেখানো, আর ভেতরে ভেতরে চলে সমঝোতা।”
বর্তমানে অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে,অভিযোগ অনুযায়ী মাসোয়ারা আদায়ের কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন এসআই আজগর, এএসআই মাহাবুব ও এএসআই মাইন উদ্দিন। স্থানীয় সূত্র ও একাধিক অভিযোগকারীর দাবি, বিভিন্ন মাদক স্পট, দেশি মদের আড্ডা ও কথিত গডফাদারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা, “ম্যানেজমেন্ট” এবং মাসিক বা সাপ্তাহিক আর্থিক লেনদেন সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই তিন কর্মকর্তার নাম বারবার সামনে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত মাসোয়ারা পৌঁছালে সংশ্লিষ্ট স্পটগুলোতে অভিযান শিথিল থাকে; আর অর্থ লেনদেনে ব্যত্যয় ঘটলেই শুরু হয় অভিযান, মামলা কিংবা হয়রানির চাপ। যদিও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার বেশি,মামলায় কম—জব্দ আলামত কোথায় যায়? ডিএনসির কিছু অভিযানে জব্দ তালিকা ও মামলার তথ্যে অসঙ্গতির অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি—
উদ্ধার ২০ কেজি গাঁজা দেখানো হলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে ১৮ কেজি,২ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মামলায় সংখ্যা কম দেখানো হয়েছে,নগদ অর্থ জব্দের ক্ষেত্রেও অমিল রয়েছে। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—জব্দ হওয়া বাকি আলামত কোথায় যায়? সংশ্লিষ্টরা কি আলামতের অংশ গোপন করছেন? নাকি জব্দ তালিকাতেই রয়েছে কারসাজি? ডিডি আনোয়ার হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন:
ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধেও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর সময়েই জেলার বিভিন্ন বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বেড বৃদ্ধি, অনুমোদন ও লাইসেন্স নবায়নে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে—পর্যাপ্ত অবকাঠামো ছাড়াই বেড সংখ্যা বৃদ্ধি,
চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের ঘাটতি,অগ্নিনিরাপত্তা না থাকা,
পৃথক কাউন্সেলিং রুম ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক সূত্রের দাবি, ফায়ার সার্ভিসের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কিছু কেন্দ্র অনুমোদন পেয়েছে। ‘মাসোয়ারা না দিলে হয়রানি’ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—দেশি মদ ব্যবসা কিংবা লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা না দিলে অভিযান, মামলা বা হয়রানির শিকার হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে—
ফুলপুরে “লাল সাধু” নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে গাঁজার মামলায় জড়ানো হয়েছে,নান্দাইলে তল্লাশির নামে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে,গৌরীপুরে আলামত ছাড়াই পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে আলোচিত। হিসাবরক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ: ডিএনসি ময়মনসিংহ কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক এম এ কবিরের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। প্রায় পাঁচ বছরের বেশি সময় একই পদে থেকে তিনি বদলি ঠেকাতে প্রভাব ও অর্থ ব্যবহার করেছেন—এমন অভিযোগ করছেন সহকর্মীরা। অভিযোগ অনুযায়ী—
অফিস সামগ্রী ক্রয়ে ভুয়া বিল-ভাউচার,স্টেশনারি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো,টিএ বিল ছাড়ে ২০ শতাংশ কমিশন দাবি,সরকারি চালান কোড গোপন রেখে দেশি মদের লাইসেন্সধারীদের কাছ থেকে প্রতি চালানে ৫০০-৬০০ টাকা ঘুষ আদায়,
বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ,কাগজ-কলম ক্রয়ের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ—এসব অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, গফরগাঁও ও নাসিরাবাদের দেশি মদের দোকানগুলোর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি এক বৈঠকে নাসিরাবাদের এক লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীর কাছে নিয়মিত অর্থ প্রদানের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য—
“কমিশন না দিলে ফাইল নড়ে না।”
তবে এম এ কবির সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
হঠাৎ সম্পদবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন:মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি—শহরে জমি,
গ্রামে বহুতল ভবন,একাধিক সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্য ঘুরছে জনমুখে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—
“সরকারি বেতনে এত সম্পদ কীভাবে সম্ভব?” জনআস্থার ভয়াবহ সংকট:
মানবাধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার ভেতরেই যদি দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, তাহলে পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে তরুণ সমাজের ওপর। স্থানীয়দের ভাষ্য—
“মাদক এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি সামাজিক মহামারিতে পরিণত হচ্ছে। পরিবার ভাঙছে, বাড়ছে ছিনতাই, সহিংসতা ও কিশোর অপরাধ।”
উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দাবি:সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ দাবি করেছেন—
১. এএসআই আমেনার ফাঁস হওয়া ভয়েস রেকর্ডের ফরেনসিক পরীক্ষা।
২. সহকারী পরিচালক কাওসারুল হাসান রনির দায়ের করা। মামলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা
৩. উদ্ধার ও জব্দ তালিকার স্বাধীন অডিট।
৪. ডিডি আনোয়ার হোসেন, এম এ কবিরসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পদ অনুসন্ধান।
৫. মাদক নিরাময় কেন্দ্র অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত।
৬.মাসোয়ারা বাণিজ্যের অভিযোগে অভিযুক্ত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ।
৭. অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ।
বক্তব্য মেলেনি: প্রতিবেদন প্রকাশের আগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য নিতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অধিকাংশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অভিযোগ গুলো এতটাই গুরুতর যে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে—“মাদকবিরোধী অবস্থানকে বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে শুধু বাহক নয়,প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ‘জিরো টলারেন্স’ কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।”