১২:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে কোরবানির হাটের দরপতন, রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় চসিক

 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাটের প্রস্তুতি জোরেশোরে চললেও এবার অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর ইজারামূল্যে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। স্থায়ী হাটগুলো থেকে ভালো রাজস্ব এলেও অস্থায়ী হাটে আশানুরূপ দর না পাওয়ায় রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, নগরীর তিনটি স্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়ে এবার প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করছে সংস্থাটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সাগরিকা পশুর হাট ৮ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজারা নিয়েছেন ফজলে আলিম চৌধুরী। মুরাদপুরের বিবিরহাট ইজারা হয়েছে ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ২০২৫ সালে একই হাটের ইজারামূল্য ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এছাড়া পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার ইজারা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৬ টাকায়।
তবে অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে চিত্র ভিন্ন। কর্ণফুলী অস্থায়ী পশুর হাটে সর্বোচ্চ ২ কোটি ১২ লাখ টাকা দর উঠলেও মুসলিমাবাদ মাঠে পাওয়া গেছে মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ওয়াজেদিয়া হাটে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২০ সালের পর এবারই অস্থায়ী হাটে সবচেয়ে কম দর পাওয়া গেছে।
চসিকের অনুমোদিত ২২টি হাট-বাজারের মধ্যে ৬টি পশুর হাট থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। তবে এবার অস্থায়ী হাটে কম দর, কোথাও টেন্ডার না হওয়া এবং খাস কালেকশন নিয়ে বিতর্কের কারণে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইজারাদার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইনে পশু বিক্রি বৃদ্ধি, ভাগাভাগি করে কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা এবং খামার থেকে সরাসরি পশু কেনার কারণে প্রচলিত হাটের ওপর নির্ভরতা কমেছে। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় অবৈধ হাট বসানোয় বৈধ হাটে ক্রেতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা, সিসিটিভি, কর্মচারী নিয়োগ ও অবকাঠামো তৈরির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইজারাদারদের খরচও বেড়েছে।
সাগরিকা পশুর হাটের ইজারাদার ফজলে আলিম চৌধুরী বলেন, “৮ কোটি টাকা দিয়ে হাট নিয়েছি। এখন সেই টাকা উঠবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। উত্তরবঙ্গ থেকে পর্যাপ্ত গরু না এলে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।”
এদিকে খাস কালেকশন নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, নির্ধারিত মূল্যে ইজারাদার না পাওয়ার অজুহাতে কয়েক বছর ধরে চসিক ইজারার পরিবর্তে খাস কালেকশনে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে হাসিল আদায়, ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, “অবৈধ পশুর হাটের কারণে প্রতিবছর রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি যানজট, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হয়। তাই এবার অবৈধ হাট বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে চসিক।”
তিনি জানান, অনুমোদিত হাটগুলোতে জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ, সিসিটিভি ক্যামেরা, পশু চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, গোখাদ্য সরবরাহ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলের ব্যবস্থা থাকবে।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, “অনুমোদিত হাটের বাইরে কোথাও পশুর বাজার বসতে দেওয়া হবে না। অবৈধ হাট উচ্ছেদে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।”
জেলা প্রশাসনের অনুমোদন অনুযায়ী এবার চসিক এলাকায় ৩টি স্থায়ী ও ৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। অস্থায়ী হাটগুলো ১৯ মে থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ১০ দিনের জন্য পরিচালিত হবে। জেলা প্রশাসনের শর্ত অনুযায়ী, প্রধান সড়ক থেকে অন্তত ১০০ গজ দূরে হাট বসাতে হবে এবং যান চলাচলে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ হাটে নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করা গেলেও অবৈধ হাট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চসিকের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

চট্টগ্রামে কোরবানির হাটের দরপতন, রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় চসিক

Update Time : ০৪:১৮:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

 

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাটের প্রস্তুতি জোরেশোরে চললেও এবার অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর ইজারামূল্যে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। স্থায়ী হাটগুলো থেকে ভালো রাজস্ব এলেও অস্থায়ী হাটে আশানুরূপ দর না পাওয়ায় রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, নগরীর তিনটি স্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়ে এবার প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করছে সংস্থাটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সাগরিকা পশুর হাট ৮ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজারা নিয়েছেন ফজলে আলিম চৌধুরী। মুরাদপুরের বিবিরহাট ইজারা হয়েছে ৬৮ লাখ ১০ হাজার টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ২০২৫ সালে একই হাটের ইজারামূল্য ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এছাড়া পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার ইজারা দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৬ টাকায়।
তবে অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে চিত্র ভিন্ন। কর্ণফুলী অস্থায়ী পশুর হাটে সর্বোচ্চ ২ কোটি ১২ লাখ টাকা দর উঠলেও মুসলিমাবাদ মাঠে পাওয়া গেছে মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ওয়াজেদিয়া হাটে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২০ সালের পর এবারই অস্থায়ী হাটে সবচেয়ে কম দর পাওয়া গেছে।
চসিকের অনুমোদিত ২২টি হাট-বাজারের মধ্যে ৬টি পশুর হাট থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। তবে এবার অস্থায়ী হাটে কম দর, কোথাও টেন্ডার না হওয়া এবং খাস কালেকশন নিয়ে বিতর্কের কারণে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইজারাদার ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইনে পশু বিক্রি বৃদ্ধি, ভাগাভাগি করে কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা এবং খামার থেকে সরাসরি পশু কেনার কারণে প্রচলিত হাটের ওপর নির্ভরতা কমেছে। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় অবৈধ হাট বসানোয় বৈধ হাটে ক্রেতা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা, সিসিটিভি, কর্মচারী নিয়োগ ও অবকাঠামো তৈরির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইজারাদারদের খরচও বেড়েছে।
সাগরিকা পশুর হাটের ইজারাদার ফজলে আলিম চৌধুরী বলেন, “৮ কোটি টাকা দিয়ে হাট নিয়েছি। এখন সেই টাকা উঠবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। উত্তরবঙ্গ থেকে পর্যাপ্ত গরু না এলে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।”
এদিকে খাস কালেকশন নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, নির্ধারিত মূল্যে ইজারাদার না পাওয়ার অজুহাতে কয়েক বছর ধরে চসিক ইজারার পরিবর্তে খাস কালেকশনে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে হাসিল আদায়, ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেন, “অবৈধ পশুর হাটের কারণে প্রতিবছর রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি যানজট, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হয়। তাই এবার অবৈধ হাট বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে চসিক।”
তিনি জানান, অনুমোদিত হাটগুলোতে জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ, সিসিটিভি ক্যামেরা, পশু চিকিৎসাসেবা, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, গোখাদ্য সরবরাহ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলের ব্যবস্থা থাকবে।
চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, “অনুমোদিত হাটের বাইরে কোথাও পশুর বাজার বসতে দেওয়া হবে না। অবৈধ হাট উচ্ছেদে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।”
জেলা প্রশাসনের অনুমোদন অনুযায়ী এবার চসিক এলাকায় ৩টি স্থায়ী ও ৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। অস্থায়ী হাটগুলো ১৯ মে থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ১০ দিনের জন্য পরিচালিত হবে। জেলা প্রশাসনের শর্ত অনুযায়ী, প্রধান সড়ক থেকে অন্তত ১০০ গজ দূরে হাট বসাতে হবে এবং যান চলাচলে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ হাটে নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করা গেলেও অবৈধ হাট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চসিকের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।