০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামুর মনিরঝিলে সংঘর্ষে বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলীর মৃত্যু, মামলায় নিরীহদের জড়ানোর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের মধ্যম মনিরঝিল এলাকায় তামাক চাষের জমিতে টিউবওয়েলের পানি প্রবাহ ও মুরগী প্রবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত এক বৃদ্ধের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলা ঘিরে এলাকায় তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের পরস্পরবিরোধী বয়ান তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং বিকেল ৪টার দিকে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে চিকনছড়ি এলাকার একটি তামাক ক্ষেতে পানি প্রবাহ ও মুরগী প্রবেশ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে পরিস্থিতি একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে মনিরঝিল পশ্চিম পাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী গুরুতর আহত হন।
তাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জানুয়ারি ২০২৫ ইং তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পাঁচ দিন পর, ৮ জানুয়ারি ২০২৫ ইং তারিখে রামু থানায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং তারিখে রামুর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়েরকৃত ভূমি সংক্রান্ত একটি মামলাকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। যাহার সি আর মামলা নং ৮০২/২০২৪ ইং। ( রামু)
তবে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল তামাক ক্ষেতের তুচ্ছ বিরোধ থেকে, ভূমি মামলার বিষয়টি পরে যুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, প্রায় দুই মাস ধরে কবির আহমদ ও মোহাম্মদ আলীর পরিবারের মধ্যে মোহাম্মদ আলীর চাষকৃত তামাক চাষের জমিতে পানি প্রবাহ ও মুরগী প্রবেশ নিয়ে বিরোধ চলছিল। ৩০ ডিসেম্বর বিকেলে মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে জয়নালের সঙ্গে আব্দু শুক্কুর, আব্দুল মান্নান ও আব্দুল হামিদের কথা কাটাকাটি হয়। পরে জয়নাল তার ভাই ফেরদৌসকে ডাকলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তিনি দাবি করেন, আমি নিজে আহত মোহাম্মদ আলীকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু পরে জানতে পারি নুরুল আমিন মেম্বার, ইসমাইল ও আমীর হোসেনসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে, অথচ তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

মামলার ১৪,১৫ ও ১৬ নম্বর আসামি নুরুল আমিন, তার ভাই মোহাম্মদ ইসমাইল ও আমীর হোসেন অভিযোগ করেন, পূর্বের জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও চলমান মামলার জেরে তাদের পরিকল্পিতভাবে জড়ানো হয়েছে।

নুরুল আমিন দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি একটি বিয়ের কাবিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং কাবিননামায় তার স্বাক্ষর রয়েছে। স্থানীয় নিরপেক্ষ সাক্ষীরাও তার অনুপস্থিতির বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে পারবেন বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য,প্রতিহিংসামূলক উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ভিডিও বক্তব্যে দাবি করেছেন, ভূমি সংক্রান্ত মামলার বিষয়টি পরবর্তীতে এজাহারে যুক্ত করা হয়েছে।

আইন সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একটি হত্যা মামলায় প্রকৃত ঘটনার পরিবর্তে ভিন্ন প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করা হলে তদন্ত বিভ্রান্ত হতে পারে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে নুরুল আমিন কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনে তিনি প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

মামলার বাদীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আসামিপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সব অভিযোগ সাজানো।

রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে মুটোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তুচ্ছ বিরোধ থেকে প্রাণহানি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি যদি পূর্ব শত্রুতার জেরে নিরপরাধ ব্যক্তিদের জড়ানো হয়ে থাকে, তবে তা হবে আরও গুরুতর অন্যায়। রামুর এই আলোচিত ঘটনায় এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

রামুর মনিরঝিলে সংঘর্ষে বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলীর মৃত্যু, মামলায় নিরীহদের জড়ানোর অভিযোগ

Update Time : ০২:৩৮:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের মধ্যম মনিরঝিল এলাকায় তামাক চাষের জমিতে টিউবওয়েলের পানি প্রবাহ ও মুরগী প্রবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত এক বৃদ্ধের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলা ঘিরে এলাকায় তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের পরস্পরবিরোধী বয়ান তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং বিকেল ৪টার দিকে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে চিকনছড়ি এলাকার একটি তামাক ক্ষেতে পানি প্রবাহ ও মুরগী প্রবেশ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে পরিস্থিতি একপর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে মনিরঝিল পশ্চিম পাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী গুরুতর আহত হন।
তাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জানুয়ারি ২০২৫ ইং তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পাঁচ দিন পর, ৮ জানুয়ারি ২০২৫ ইং তারিখে রামু থানায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং তারিখে রামুর বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়েরকৃত ভূমি সংক্রান্ত একটি মামলাকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। যাহার সি আর মামলা নং ৮০২/২০২৪ ইং। ( রামু)
তবে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল তামাক ক্ষেতের তুচ্ছ বিরোধ থেকে, ভূমি মামলার বিষয়টি পরে যুক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, প্রায় দুই মাস ধরে কবির আহমদ ও মোহাম্মদ আলীর পরিবারের মধ্যে মোহাম্মদ আলীর চাষকৃত তামাক চাষের জমিতে পানি প্রবাহ ও মুরগী প্রবেশ নিয়ে বিরোধ চলছিল। ৩০ ডিসেম্বর বিকেলে মোহাম্মদ আলী ও তার ছেলে জয়নালের সঙ্গে আব্দু শুক্কুর, আব্দুল মান্নান ও আব্দুল হামিদের কথা কাটাকাটি হয়। পরে জয়নাল তার ভাই ফেরদৌসকে ডাকলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তিনি দাবি করেন, আমি নিজে আহত মোহাম্মদ আলীকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু পরে জানতে পারি নুরুল আমিন মেম্বার, ইসমাইল ও আমীর হোসেনসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে, অথচ তারা ঘটনাস্থলে ছিলেন না।

মামলার ১৪,১৫ ও ১৬ নম্বর আসামি নুরুল আমিন, তার ভাই মোহাম্মদ ইসমাইল ও আমীর হোসেন অভিযোগ করেন, পূর্বের জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও চলমান মামলার জেরে তাদের পরিকল্পিতভাবে জড়ানো হয়েছে।

নুরুল আমিন দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি একটি বিয়ের কাবিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং কাবিননামায় তার স্বাক্ষর রয়েছে। স্থানীয় নিরপেক্ষ সাক্ষীরাও তার অনুপস্থিতির বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে পারবেন বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য,প্রতিহিংসামূলক উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি ভিডিও বক্তব্যে দাবি করেছেন, ভূমি সংক্রান্ত মামলার বিষয়টি পরবর্তীতে এজাহারে যুক্ত করা হয়েছে।

আইন সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একটি হত্যা মামলায় প্রকৃত ঘটনার পরিবর্তে ভিন্ন প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করা হলে তদন্ত বিভ্রান্ত হতে পারে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে নুরুল আমিন কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনে তিনি প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।

মামলার বাদীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আসামিপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সব অভিযোগ সাজানো।

রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে মুটোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মোবাইল বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তুচ্ছ বিরোধ থেকে প্রাণহানি যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি যদি পূর্ব শত্রুতার জেরে নিরপরাধ ব্যক্তিদের জড়ানো হয়ে থাকে, তবে তা হবে আরও গুরুতর অন্যায়। রামুর এই আলোচিত ঘটনায় এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।