১০:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালিয়াকৈরে দুই মণ ধানের দামে এক মণ ওজনের কামলা,পানি-কাদায় ধান কাটলে ১৪০০ টাকা

 

 

শাকিল হোসেন,কালিয়াকৈর (গাজীপুর)প্রতিনিধিঃ

 

নতুন বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও কালিয়াকৈরে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। দুই মণ ধানের দামে মিলছেএক মণ ওজনের একেকজন কামলা। রুগ্ন, হাড় জিরজিরে শরীর-মাংস নেই, শুধু হাড্ডিসার দেহ নিয়ে জীবিকার তাগিদে ভোর থেকে সদর বাজারে ভিড় করছেন শত শত ধান কাটার শ্রমিক।

শুক্রবার ভোর ৬টায় কালিয়াকৈর বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে সারি সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে হাতে লাটি ও কাস্তে-লুঙ্গি পরে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে শত শত শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছেন। উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর থেকে আসা এসব শ্রমিকের বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভুগছেন। সন্তানের মুখে দু’বেলা ভাত তুলতে তারা এসেছেন ধান কাটতে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব জমির উদ্দিন বলেন, শরীরে মাংস নাই, শুধু হাড্ডি। পেটের দায়ে আইছি। ১৩০০ টাকার কমে কামে যামু না। আর যদি জমিতে হাঁটু পানি-কাদা থাকে, তাইলে ১৪০০ টাকা দেওয়া লাগব।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল হামিদ জানান,বর্তমানে এক মণ মোটা ধানের বাজার দর ৭০০ থেকে ৮০০টাকা। অর্থাৎ দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন কামলার একদিনের মজুরি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে তিন বেলা খাবার ও দু’বেলা বিড়ি সিগারেট নাস্তার খরচ।
গত বছর ৯০০ টাকায় কামলা পাইছিলাম। এবার খরচ দ্বিগুণ। ধানের দাম কম, খরচ বেশি। এভাবে চললে লাভ তো দূর, খরচই উঠব না বলেন আরেক কৃষক মনির হোসেন।

শ্রমিকরা বলছেন, বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজির দাম আকাশছোঁয়া। তাছাড়া উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে জনপ্রতি গাড়ি ভাড়া৭০০-৮০০ টাকা লাগে। আবার ঝড়-বৃষ্টির কারণে এবার জমিতে পানি জমেছে। কাদা-পানিতে কাজ করা কষ্টের, অসুখের ঝুঁকিও বেশি। তাই মজুরি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে আসা কামাল বলেন,বউ মারা গেছে। তিনটা পোলাপান। হাড্ডিসার শরীর নিয়া আইছি। ১৪০০ টাকা না হইলে পোলাপান কী খাইব?

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতেএবার কালিয়াকৈরে জমিতে এবার বোরো ধানের অনেক ফলন হয়েছে। শ্রমিক সংকট আছে,তবে কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি। ইতিমধ্যে কয়েকটি সরকারি হারভেস্টার কৃষকদের দেওয়া হয়েছে।এতে খরচ ৪০ শতাংশ কমবে।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে হবে,আবার কৃষকও যেন না ঠকে সেটা দেখতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী যাতে সুযোগ না নেয় সেজন্য বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর সম্ভাবনা রয়েছে। সময়মতো ধান না কাটতে পারলে মাঠেই নষ্ট হবে ফসল। ফলে বেশি মজুরি দিয়েই কামলা নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।দুই মণ ধানের দামে এক মণ ওজনের কামলা— এই হিসাব মেলাতে গিয়ে দিশেহারা কালিয়াকৈরের কৃষক ও শ্রমিক দু’পক্ষই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

কালিয়াকৈরে দুই মণ ধানের দামে এক মণ ওজনের কামলা,পানি-কাদায় ধান কাটলে ১৪০০ টাকা

Update Time : ০১:৫০:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬

 

 

শাকিল হোসেন,কালিয়াকৈর (গাজীপুর)প্রতিনিধিঃ

 

নতুন বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও কালিয়াকৈরে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। দুই মণ ধানের দামে মিলছেএক মণ ওজনের একেকজন কামলা। রুগ্ন, হাড় জিরজিরে শরীর-মাংস নেই, শুধু হাড্ডিসার দেহ নিয়ে জীবিকার তাগিদে ভোর থেকে সদর বাজারে ভিড় করছেন শত শত ধান কাটার শ্রমিক।

শুক্রবার ভোর ৬টায় কালিয়াকৈর বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের দুই পাশে সারি সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে হাতে লাটি ও কাস্তে-লুঙ্গি পরে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে শত শত শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছেন। উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর থেকে আসা এসব শ্রমিকের বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভুগছেন। সন্তানের মুখে দু’বেলা ভাত তুলতে তারা এসেছেন ধান কাটতে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব জমির উদ্দিন বলেন, শরীরে মাংস নাই, শুধু হাড্ডি। পেটের দায়ে আইছি। ১৩০০ টাকার কমে কামে যামু না। আর যদি জমিতে হাঁটু পানি-কাদা থাকে, তাইলে ১৪০০ টাকা দেওয়া লাগব।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল হামিদ জানান,বর্তমানে এক মণ মোটা ধানের বাজার দর ৭০০ থেকে ৮০০টাকা। অর্থাৎ দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন কামলার একদিনের মজুরি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে তিন বেলা খাবার ও দু’বেলা বিড়ি সিগারেট নাস্তার খরচ।
গত বছর ৯০০ টাকায় কামলা পাইছিলাম। এবার খরচ দ্বিগুণ। ধানের দাম কম, খরচ বেশি। এভাবে চললে লাভ তো দূর, খরচই উঠব না বলেন আরেক কৃষক মনির হোসেন।

শ্রমিকরা বলছেন, বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজির দাম আকাশছোঁয়া। তাছাড়া উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে জনপ্রতি গাড়ি ভাড়া৭০০-৮০০ টাকা লাগে। আবার ঝড়-বৃষ্টির কারণে এবার জমিতে পানি জমেছে। কাদা-পানিতে কাজ করা কষ্টের, অসুখের ঝুঁকিও বেশি। তাই মজুরি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে আসা কামাল বলেন,বউ মারা গেছে। তিনটা পোলাপান। হাড্ডিসার শরীর নিয়া আইছি। ১৪০০ টাকা না হইলে পোলাপান কী খাইব?

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতেএবার কালিয়াকৈরে জমিতে এবার বোরো ধানের অনেক ফলন হয়েছে। শ্রমিক সংকট আছে,তবে কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি। ইতিমধ্যে কয়েকটি সরকারি হারভেস্টার কৃষকদের দেওয়া হয়েছে।এতে খরচ ৪০ শতাংশ কমবে।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে হবে,আবার কৃষকও যেন না ঠকে সেটা দেখতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী যাতে সুযোগ না নেয় সেজন্য বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর সম্ভাবনা রয়েছে। সময়মতো ধান না কাটতে পারলে মাঠেই নষ্ট হবে ফসল। ফলে বেশি মজুরি দিয়েই কামলা নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।দুই মণ ধানের দামে এক মণ ওজনের কামলা— এই হিসাব মেলাতে গিয়ে দিশেহারা কালিয়াকৈরের কৃষক ও শ্রমিক দু’পক্ষই।