১০:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পীরগঞ্জে একতা ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মায়ের মৃত্যু: টাকার বিনিময়ে রফাদফা

জাহাঙ্গীর আলম ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ‘একতা ক্লিনিক এন্ড নার্সিং হোম’-এ ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলেও একটি প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার (রফাদফা) চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, গত ২১ এপ্রিল রাণীশংকৈল উপজেলার বিষ্ণুপুর এলাকার আনিসুর রহমানের স্ত্রী শারমিন আক্তারের প্রসব বেদনা উঠলে তাকে পীরগঞ্জের একতা ক্লিনিক এন্ড নার্সিং হোমে আনা হয়। ১১ হাজার টাকায় সিজারের চুক্তিতে তাকে ভর্তি করায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। ওই রাতেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। অপারেশনের পর রোগীর অবস্থার অবনতি হলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গোপন রাখে। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ স্বজনদের সহযোগিতায় রোগীকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ২৩ এপ্রিল আবারও তার অপারেশন করা হয়। এতে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে এবং তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

নিহতের স্বামী আনিসুর রহমান বলেন, একতা ক্লিনিকের অব্যবস্থাপনা এবং অদক্ষ চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করার কারণেই এই অকাল মৃত্যু ঘটেছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। ভুল চিকিৎসার কারণেই আমার স্ত্রী মারা গেছে। নবজাতক শিশুটির এখন কি হবে?

ঘটনার পর পরই নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির মধ্যস্থতায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে আপস-মীমাংসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাদের দায় এড়াতে নিহতের পরিবারকে মোটা অংকের টাকার প্রস্তাব দেয়। লোকলজ্জা ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ভয়ে শেষ পর্যন্ত নিহতের পরিবার চাপের মুখে বা প্রলোভনে পড়ে আপস করতে বাধ্য হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।

একতা ক্লিনিকের পরিচালক আসলাম জানান, রোগীর অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল। হৃদরোগ ও কিডনিসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিল। সিজারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও অন্যান্য সমস্যা দেখা দিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়। ক্লিনিকে তার মৃত্যু হয়নি। বিষয়টি আপোষ মিমাংসা করে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত)ডাঃ আবুল বাশার মোঃ সাহেদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে ভুল চিকিৎসায় রোগীর প্রাণ গেলেও এই ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সচেতন মহলের দাবি, ক্লিনিকটি সিলগালা করা সহ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।

পীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রামাণিক জানান, প্রসূতির মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখে। যেহেতু মৃত্যুটি অন্য জেলায় হয়েছে, তাই স্থানীয়ভাবে আমাদের আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া এ বিষয়ে কারো কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

পীরগঞ্জে একতা ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি মায়ের মৃত্যু: টাকার বিনিময়ে রফাদফা

Update Time : ০৬:১৬:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

জাহাঙ্গীর আলম ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ‘একতা ক্লিনিক এন্ড নার্সিং হোম’-এ ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলেও একটি প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার (রফাদফা) চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, গত ২১ এপ্রিল রাণীশংকৈল উপজেলার বিষ্ণুপুর এলাকার আনিসুর রহমানের স্ত্রী শারমিন আক্তারের প্রসব বেদনা উঠলে তাকে পীরগঞ্জের একতা ক্লিনিক এন্ড নার্সিং হোমে আনা হয়। ১১ হাজার টাকায় সিজারের চুক্তিতে তাকে ভর্তি করায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। ওই রাতেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। অপারেশনের পর রোগীর অবস্থার অবনতি হলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গোপন রাখে। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ স্বজনদের সহযোগিতায় রোগীকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ২৩ এপ্রিল আবারও তার অপারেশন করা হয়। এতে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে এবং তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

নিহতের স্বামী আনিসুর রহমান বলেন, একতা ক্লিনিকের অব্যবস্থাপনা এবং অদক্ষ চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করার কারণেই এই অকাল মৃত্যু ঘটেছে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। ভুল চিকিৎসার কারণেই আমার স্ত্রী মারা গেছে। নবজাতক শিশুটির এখন কি হবে?

ঘটনার পর পরই নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির মধ্যস্থতায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে আপস-মীমাংসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তাদের দায় এড়াতে নিহতের পরিবারকে মোটা অংকের টাকার প্রস্তাব দেয়। লোকলজ্জা ও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ভয়ে শেষ পর্যন্ত নিহতের পরিবার চাপের মুখে বা প্রলোভনে পড়ে আপস করতে বাধ্য হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।

একতা ক্লিনিকের পরিচালক আসলাম জানান, রোগীর অবস্থা আগে থেকেই খারাপ ছিল। হৃদরোগ ও কিডনিসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিল। সিজারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও অন্যান্য সমস্যা দেখা দিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়। ক্লিনিকে তার মৃত্যু হয়নি। বিষয়টি আপোষ মিমাংসা করে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত)ডাঃ আবুল বাশার মোঃ সাহেদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে ভুল চিকিৎসায় রোগীর প্রাণ গেলেও এই ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সচেতন মহলের দাবি, ক্লিনিকটি সিলগালা করা সহ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।

পীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রামাণিক জানান, প্রসূতির মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখে। যেহেতু মৃত্যুটি অন্য জেলায় হয়েছে, তাই স্থানীয়ভাবে আমাদের আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া এ বিষয়ে কারো কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।