০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৪তম গ্রেডে চাকরি, অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ইউপি সচিব বারেক

বিশেষ প্রতিনিধি ঢাকা

চাকরি করেন ১৪তম গ্রেডের একজন সাধারণ ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু মাত্র এক দশকের ব্যবধানে তার জীবনযাত্রায় এসেছে রাজকীয় পরিবর্তন। বহুতল ভবন, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়ে এখন তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের অধিপতি। সাভারের তেতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব এবং বর্তমানে ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত মীর আব্দুল বারেকের এই অবিশ্বাস্য উত্থান এখন স্থানীয়দের কাছে বিস্ময় ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মীর আব্দুল বারেক সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। রাজনৈতিক এই ছত্রছায়াকে পুঁজি করেই তিনি গত ১০ বছরে মেতেছিলেন সীমাহীন দুর্নীতিতে। তেতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে থাকাকালীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, টিআর-কাবিখা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এক সময়কার সাধারণ এই কর্মচারী এখন বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক, যা তার বৈধ আয়ের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তেতুলঝোড়া এলাকায় মীর আব্দুল বারেকের নামে একটি বিশাল পাঁচতলা ভবন রয়েছে। এছাড়া একই এলাকায় নামে-বেনামে অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ দামি জমি ক্রয় করেছেন তিনি। তার সম্পদের বিস্তার শুধু সাভারেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজধানীর কল্যাণপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট ও বিলাসবহুল বাড়ি থাকার তথ্যও লোকমুখে ঘুরছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—একজন ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী হয়ে কোন জাদুর কাঠিতে তিনি এত অল্প সময়ে শতকোটি টাকার মালিক হলেন?
মীর আব্দুল বারেকের এই দাপটের নেপথ্যে রয়েছে তার প্রাতিষ্ঠানিক পদবীও। তিনি ইউপি সচিবদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ সেক্রেটারি সমিতি’ (বাপসা)-এর ঢাকা জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই পদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। এই পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন বদলি বাণিজ্য ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট অনেকের দাবি।

 

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বলয়ে থেকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় স্থানীয়দের একাংশ তাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের কারণে সেগুলো হিমাগারে চলে গেছে। কোনো কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার এই দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ্যে আসায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

 

মীর আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব দুর্নীতির অভিযোগ, অবৈধ সম্পদের পাহাড় এবং তার পেছনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক নিয়ে ইতোমধ্যে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তার নামে-বেনামে থাকা সম্পত্তির দলিল, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ এবং প্রশাসনিক প্রভাবের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে দৈনিক নববাণী। খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্বে তার বিপুল সম্পদের সুনির্দিষ্ট উৎস ও প্রামাণ্য দলিল সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে।

সরকারি কর্মচারী হয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার এই প্রবণতা আইনের শাসনের পরিপন্থী। মীর আব্দুল বারেকের মতো ব্যক্তিদের অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজে বের করে তাদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপই পারে এমন দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গুলশানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল, ৫ দিন পর ওসি বদলি

১৪তম গ্রেডে চাকরি, অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ইউপি সচিব বারেক

Update Time : ০৫:২৫:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

বিশেষ প্রতিনিধি ঢাকা

চাকরি করেন ১৪তম গ্রেডের একজন সাধারণ ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে। কিন্তু মাত্র এক দশকের ব্যবধানে তার জীবনযাত্রায় এসেছে রাজকীয় পরিবর্তন। বহুতল ভবন, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়ে এখন তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের অধিপতি। সাভারের তেতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব এবং বর্তমানে ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত মীর আব্দুল বারেকের এই অবিশ্বাস্য উত্থান এখন স্থানীয়দের কাছে বিস্ময় ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, মীর আব্দুল বারেক সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এলাকায় পরিচিত। রাজনৈতিক এই ছত্রছায়াকে পুঁজি করেই তিনি গত ১০ বছরে মেতেছিলেন সীমাহীন দুর্নীতিতে। তেতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে থাকাকালীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, টিআর-কাবিখা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এক সময়কার সাধারণ এই কর্মচারী এখন বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক, যা তার বৈধ আয়ের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তেতুলঝোড়া এলাকায় মীর আব্দুল বারেকের নামে একটি বিশাল পাঁচতলা ভবন রয়েছে। এছাড়া একই এলাকায় নামে-বেনামে অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ দামি জমি ক্রয় করেছেন তিনি। তার সম্পদের বিস্তার শুধু সাভারেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজধানীর কল্যাণপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট ও বিলাসবহুল বাড়ি থাকার তথ্যও লোকমুখে ঘুরছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—একজন ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী হয়ে কোন জাদুর কাঠিতে তিনি এত অল্প সময়ে শতকোটি টাকার মালিক হলেন?
মীর আব্দুল বারেকের এই দাপটের নেপথ্যে রয়েছে তার প্রাতিষ্ঠানিক পদবীও। তিনি ইউপি সচিবদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ সেক্রেটারি সমিতি’ (বাপসা)-এর ঢাকা জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই পদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। এই পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন বদলি বাণিজ্য ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট অনেকের দাবি।

 

দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বলয়ে থেকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় স্থানীয়দের একাংশ তাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের কারণে সেগুলো হিমাগারে চলে গেছে। কোনো কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার এই দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ্যে আসায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

 

মীর আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব দুর্নীতির অভিযোগ, অবৈধ সম্পদের পাহাড় এবং তার পেছনের প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক নিয়ে ইতোমধ্যে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তার নামে-বেনামে থাকা সম্পত্তির দলিল, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ এবং প্রশাসনিক প্রভাবের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে দৈনিক নববাণী। খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্বে তার বিপুল সম্পদের সুনির্দিষ্ট উৎস ও প্রামাণ্য দলিল সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে।

সরকারি কর্মচারী হয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার এই প্রবণতা আইনের শাসনের পরিপন্থী। মীর আব্দুল বারেকের মতো ব্যক্তিদের অবৈধ সম্পদের উৎস খুঁজে বের করে তাদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপই পারে এমন দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে।