
মোঃ নাঈম উদ্দীন
বিশেষ প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে অ্যাপেন্ডিসাইটের অপারেশনের পর সোহাগী খাতুন (১৪) নামের এক মেধাবী কিশোরীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকের অবহেলা, ভুল চিকিৎসা ও অতিরিক্ত ঘুমের ইনজেকশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। গত রোববার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মৃত সোহাগী খাতুন জীবননগর উপজেলার হাসাদাহ ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মোমিনুর রহমান মন্ডলের মেয়ে। সে স্থানীয় বিসিকেএমপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট পেটে ব্যথা অনুভব করলে সোহাগীকে অসুস্থ অবস্থায় জীবননগরের ‘মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোম’-এ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডা. রফিকুল ইসলাম দাবি করেন যে সোহাগীর অ্যাপেন্ডিসাইট হয়েছে এবং দ্রুত অপারেশন করাতে হবে। পরদিন ডা. রফিকুল ইসলাম নিজেই তার অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করেন।
অস্ত্রোপচারের দুই দিন পর গত ৩০ আগস্ট তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। তবে বাড়িতে ফেরার পর থেকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তার প্রচণ্ড বমি, মাথাব্যথা ও জ্বর শুরু হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে গত ২ সেপ্টেম্বর তাকে পুনরায় ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়।
সোহাগীর মা লাভলী খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘অপারেশনের পর থেকেই আমার মেয়ের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী তিন দিন পর তাকে বাড়ি নিয়ে গেলেও সে সুস্থ ছিল না। বাড়িতে নেওয়ার পর অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে আবার মনোয়ারা সনো সেন্টারে ভর্তি করি। কিন্তু তখন ডা. রফিকুল ইসলাম আমাদের সঙ্গে খুবই খারাপ আচরণ করেন এবং চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রোগীকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তবে কিছু সময় পর তিনি নিজেই আবার ডেকে মেয়েকে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু চিকিৎসায় কোনো উন্নতি না হয়ে অবস্থা আরও অবনতি হতে থাকে। সর্বশেষ তিনি ওষুধের পাশাপাশি একটি ঘুমের ইনজেকশন দেন। ওই ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই সোহাগীর আর জ্ঞান ফেরেনি।’
তিনি আরও জানান, পরদিনও মেয়ের জ্ঞান না ফেরায় ডা. রফিকুল ইসলাম তাদের দ্রুত রোগীকে যশোরের কুইন্স হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে নেওয়ার পর সোহাগীর তীব্র খিচুনি শুরু হয় এবং অবস্থার চরম অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকা নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলেন। ঢাকায় পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তাকে অবিলম্বে আইসিইউতে (ICU) ভর্তি করার পরামর্শ দেন। আইসিইউতে নেওয়ার মাত্র আধা ঘণ্টা পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃতের খালা নাসিমা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মনোয়ারা নার্সিং হোমের ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদের আচরণ অত্যন্ত খারাপ ছিল। রোগীর স্বজনদের সঙ্গে তারা প্রতিনিয়ত খারাপ ব্যবহার ও গালিগালাজ করতেন। ঢাকার চিকিৎসকরা আমাদের আগের সেই টেস্টের রিপোর্ট দেখে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তখন অপারেশন করার মতো কোনো পরিস্থিতিই ছিল না।’
সোহাগীর বাবা মোমিনুর রহমান মন্ডল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়েটা ডাক্তার ও নার্সদের অবহেলা আর অপচিকিৎসার শিকার হয়ে মারা গেল। আমি এর বিচার চাই, যাতে আর কোনো বাবার কোল এভাবে খালি না হয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, অভিযুক্ত ডা. রফিকুল ইসলাম মূলত ঢাকায় অবস্থান করেন। তিনি সপ্তাহের কেবল বৃহস্পতি ও শুক্রবার জীবননগরে এসে চেম্বার করেন এবং ওই দুই দিনেই বিভিন্ন রোগীর অস্ত্রোপচার করে থাকেন। এর আগেও ওই ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসার কারণে এ ধরনের কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে এর আগে সাংবাদিকদের কাছে তিনি শুধু অপারেশন করার কথা স্বীকার করেছিলেন এবং পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে তার কিছু জানা নেই বলে দাবি করেছিলেন।
ঘটনাটি সম্পর্কে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং ক্লিনিকে গিয়ে সরেজমিন বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধির নাম 



















